রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে করণীয়

প্রকাশিত: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

চলছে সিয়াম সাধনার মাস। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এ দেশে মানুষের কাছে পবিত্র রমজান মাস কেবল ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা নয় বরং আত্মশুদ্ধি এবং পারস্পরিক সহমর্মিতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বর্তমানে এই পবিত্র মাসটি অনেক সময় সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জন্য অর্থনৈতিক দিক থেকে চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একদিকে তারা রোজা পালন করেন, অন্যদিকে বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি তাদের দৈনন্দিন জীবনকে কঠিন করে তোলে। প্রতি বছর এক শ্রেণির ব্যবসায়ী রোজার সময় খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম কৃত্রিমভাবে বৃদ্ধি করে। চাল, ডাল, তেল, চিনি, সবজি, গোশত- প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের দাম এই সময়ে বৃদ্ধি পায় হঠাৎ করে। ফলে যারা নিম্ন আয়-রোজগারের ওপর নির্ভরশীল, তদের দৈনন্দিন খাবারের চাহিদা মেটানো কঠিন হয়ে যায়। আর এসবের পেছনে কাজ করে শক্তিশালী সিন্ডিকেট চক্র। সম্প্রতি একটি ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করছেন ব্যবসায়ী শ্রমিক নেতা। যা প্রমান করে তাদের হাত কতটা শক্তিশালী। তাই দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকারি পদক্ষেপ একান্ত প্রয়োজন। নিয়মিত বাজার মনিটরিং, দামের তালিকা প্রকাশ, ওষুধ, খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সীমিত মূল্য নির্ধারণ- এসবই কার্যকর উপায়ে হতে পারে। শুধু প্রশাসনিক নজরদারি নয়, সচেতন নাগরিকের অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ। গ্রাহক, ভোক্তা অধিকার সংস্থা এবং স্থানীয় প্রশাসন মিলে একসঙ্গে কাজ করলে ব্যবসায়ীদের অযৌক্তিক মূল্য বৃদ্ধি কমানো সম্ভব।

কেন বাড়ে দাম:
রমজানে চাহিদায় পরিবর্তন আসে। ইফতার ও সেহরির জন্য ছোলা, ডাল, চিনি, খেজুর, তেল, পেঁয়াজ, বেগুন, শসা, মুরগি ও গরুর মাংসের চাহিদা বেড়ে যায়। এই বাড়তি চাহিদাকে কেন্দ্র করে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরি করেন। গুদামজাত করে সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া, পাইকারি ও খুচরা বাজারে সমন্বয়হীনতা- সব মিলিয়ে বাজারে অস্থিরতা বাড়ে। আর বাজার ব্যবস্থাপনায় পরিকল্পনার ঘাটতি থাকলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের পকেটে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, বর্তমানে এক হালি লেবুর দাম ১০০ টাকা এবং এক কেজি শসার দাম ৮০ টাকা।

সরকারের পদক্ষেপ:
প্রত্যাশা, নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকরী ভূমিকা গ্রহণ করবে। যদি সরকার সফলভাবে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তবে এটি তাদের প্রতি মানুষের আস্থা এবং রাষ্ট্রীয় কার্যক্ষমতার একটি শক্তিশালী পদক্ষেপ হবে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা। এটি সরকারের জন্য শুধু রাজনৈতিক দায়িত্ব নয় বরং সামাজিক ও অর্থনৈতিক দায়িত্বও বটে।
এছাড়াও ব্যবসায়ীদের মধ্যে সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধ জাগ্রত করা অপরিহার্য। রোজার সময় পণ্যের দাম বৃদ্ধির পেছনে থাকে লোভ এবং স্বার্থচিন্তা। এক্ষেত্রে সরকারের উচিত মিডিয়ার মাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচারণা, স্থানীয় সমিতি ও ব্যবসায়ী সংগঠনের সঙ্গে সমন্বয় এবং নিয়মিত মূল্য তালিকা প্রকাশের মাধ্যমে বাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশে রমজান ঘিরে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে প্রতি বছরই বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও প্রশাসন বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়। বিশেষ করে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) কম দামে নিত্যপণ্য বিক্রির মাধ্যমে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে কিছুটা স্বস্তি দেয়। টিসিবির ট্রাকসেল বা কার্ডভিত্তিক বিক্রয় কর্মসূচি বাজারে একটি বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরি করে। তবে প্রশ্ন হলো এই উদ্যোগ কতটা কার্যকর ও বিস্তৃত? অনেক সময় দেখা যায়, টিসিবির পণ্য সীমিত, লাইনে দীর্ঘ ভোগান্তি, আবার কোথাও কোথাও তালিকাভুক্তির জটিলতা। ফলে প্রকৃত সুবিধাভোগীরা প্রায়ই বঞ্চিত হন।

বাজার তদারকির বাস্তবতা:
রমজানে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত সক্রিয় থাকে। জরিমানা, সতর্কীকরণ-সবই হয়। কিন্তু এই অভিযানের ধারাবাহিকতা প্রায়ই প্রশ্নবিদ্ধ। সাময়িক অভিযান দিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ দীর্ঘমেয়াদে সম্ভব নয়, যদি না সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা যায়। একটি কার্যকর বাজারব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে পাইকারি থেকে খুচরা পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে নজরদারি ও তথ্যপ্রবাহ স্বচ্ছ করতে হবে। প্রযুক্তিনির্ভর মূল্যতালিকা প্রকাশ, অনলাইন মনিটরিং এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির দ্রুত ব্যবস্থা হতে পারে টেকসই সমাধানের অংশ।

ভোক্তার সচেতনতা:
দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ভোক্তার ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। অযথা আতঙ্কে অতিরিক্ত কেনাকাটা, মজুত করে রাখা- এসব আচরণও বাজারে চাপ সৃষ্টি করে। পরিকল্পিত কেনাকাটা, প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যয় এবং অপচয় রোধ- এসবের মাধ্যমে বাজারে ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব। এছাড়া কোনো পণ্যের অতিরিক্ত দাম নিলে অভিযোগ করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। ভোক্তা অধিকার সংক্রান্ত হটলাইন ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার বাড়াতে হবে।

দীর্ঘমেয়াদি করণীয়:
রমজানভিত্তিক সাময়িক উদ্যোগের বাইরে গিয়ে বছরজুড়ে একটি স্থিতিশীল সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে তোলা জরুরি। কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ, কোল্ড স্টোরেজ বৃদ্ধি, মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা কমানো এবং কৃষক থেকে সরাসরি বাজারে পণ্য পৌঁছানোর ব্যবস্থা বাড়াতে হবে।
সরকার, ব্যবসায়ী ও ভোক্তা- তিন পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। বর্তমান সরকার দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে এটি সামাজিক অসন্তোষের কারণ হতে পারে, যা সরকারকে প্রথম মাসেই জনমতের পরীক্ষার মুখে দাঁড় করাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *