অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় চ্যালেঞ্জ

প্রকাশিত: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

সম্প্রতি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) গ্লোবাল রিস্ক রিপোর্ট-২০২৬ প্রকাশিত হয়েছে এবং এই রিপোর্টে চলতি বছর দেশের অর্থনীতির সামনে পাঁচটি বড় ঝুঁকি স্পষ্টভাবে চিহ্নিত হয়েছে। এই ঝুঁকির তালিকার শীর্ষে রয়েছে অপরাধ ও অবৈধ অর্থনৈতিক কার্যক্রমের বিস্তার। এর পরই রয়েছে ভূঅর্থনৈতিক সংঘাত, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধীরগতি এবং ঋণের বাড়তি চাপ। সংস্থাটির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই ঝুঁকিগুলো একসঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে চাপে ফেলতে পারে। এখন পর্যায়ক্রমে এ বিষয় নিয়ে আলোচনাই এই প্রবন্ধের মুখ্য উদ্দেশ্য।

অবৈধ আর্থিক কর্মকাণ্ড :
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হবে চাঁদাবাজি, অর্থ পাচার ও অন্যান্য অবৈধ আর্থিক কর্মকাণ্ড। এসব কার্যক্রম বিনিয়োগ পরিবেশ দুর্বল করে এবং সুশাসনের ওপর আস্থা কমিয়ে দেয়। ডব্লিউইএফের জরিপে অংশ নেওয়া ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা এ ঝুঁকিকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।

ভূঅর্থনৈতিক সংঘাত :
ভূঅর্থনৈতিক সংঘাত-এর মধ্যে রয়েছে নিষেধাজ্ঞা, শুল্ক আর বিনিয়োগ। এ বিষয়গুলো বৈশ্বিক বাণিজ্যকে অনিশ্চিত করছে, যার প্রভাব বাংলাদেশের মতো রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিতেও পড়তে পারে। বৈশ্বিক  প্রেক্ষাপটে ডব্লিউইএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হয়ে উঠবে ভূঅর্থনৈতিক সংঘাত। বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা দ্রুত বাড়ছে, যা বৈশ্বিক স্থিতিশীলতাকে ক্রমেই অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এর পরই রয়েছে রাষ্ট্রীয় সংঘাত। বিভিন্ন দেশে অর্থনৈতিক চাপ ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন বাড়তে থাকায় বৈশ্বিক অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক আরও নাজুক হয়ে উঠছে।

মূল্যস্ফীতি :
এখানে দেখা যায় যে দেশে টানা প্রায় চার বছর উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ রয়েছে। ২০২৫ সালে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) প্রকাশিত ‘ইকোনমিক আপডেট অ্যান্ড আউটলুক, জানুয়ারি ২০২৬’ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ডিসেম্বর মাসে মজুরির হার ছিল ৮ দশমিক ০৭ শতাংশ, যা নভেম্বরে ছিল ৮ দশমিক ০৪ শতাংশ। ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ, যা আগের মাসে ছিল ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। অর্থাৎ যে হারে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে সে হারে মজুরি বা আয় বাড়েনি। বেসরকারি খাতের বড় একটি অংশে এখনো আগের বছরের মজুরি কাঠামো বহাল আছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট স্থগিত বা নামমাত্র পর্যায়ে রাখা হয়েছে। তৈরি পোশাক, ক্ষুদ্র শিল্প, পরিবহন, হোটেল-রেস্তোরাঁ ও খুচরা ব্যবসার শ্রমিকদের আয় কার্যত স্থির। সরকারি চাকরিতেও সর্বশেষ বেতন কাঠামোর পর থেকে সময় গড়ালেও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কোনো স্বয়ংক্রিয় সমন্বয় ব্যবস্থা নেই। ফলে বাস্তব মজুরি কমছে, যদিও কাগজে-কলমে বেতন অপরিবর্তিত।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি :
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশার চেয়ে কম থাকতে পারে যা সংখ্যাতত্ত্বের ভিত্তিতে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৬ শতাংশে থাকতে পারে। প্রতিবেদনে মন্দা বা স্থবিরতার আশঙ্কার কথাও বলা হয়েছে।

ঋণের চাপ:
সরকারি, করপোরেট ও পারিবারিক-সব ধরনের ঋণই এতে অন্তর্ভুক্ত। বিশ্লেষকদের মতে, ঋণের সুদ পরিশোধ এখন জাতীয় বাজেটের বড় অংশ দখল করছে, যা ভবিষ্যতে রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় চাপ বাড়াতে পারে।

ডব্লিউইএফ ও সিপিডি গবেষনা :
ডব্লিউইএফের অংশীদার গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এর গবেষণা পরিচালক জানান, ২০২৫ সালের মে থেকে জুলাইয়ের মধ্যে ১০২টি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহীর মতামত নিয়ে জরিপটি তৈরি করা হয়। মোট ৩৪টি সম্ভাব্য ঝুঁকি থেকে আগামী দুই বছরের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকিগুলো বাছাই করতে বলা হয়েছিল। জরিপের সময় দেশে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বেড়ে যাওয়ায় সেটি শীর্ষ ঝুঁকি হিসেবে উঠে এসেছে। তবে বর্তমানে পরিস্থিতিতে কিছুটা পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। অপরাধ কমলেও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বেড়েছে। মূল্যস্ফীতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার নতুন ঝুঁকি সৃষ্টি করছে।

(ডব্লিউইএফ) গ্লোবাল রিস্ক রিপোর্ট-২০২৬ :
একটি নিরপেক্ষ মূল্যায়ন গষেবকবৃন্দ কেবল ঝুঁকি শনাক্ত করেছে কিন্তু তার সম্ভাব্য সমাধান তেমনভাবে উল্লেখ করতে সক্ষম হয়নি যা এই প্রতিবেদনের একটি বড় দুর্বলতা। বাংলাদেশে অবৈধ আর্থিক কর্মকাণ্ড যেমন হুন্ডি ব্যবসা, অর্থপাচার, চাঁদাবাজি, ঘুষ লেনদেন ইত্যাদি তেমন নতুন কিছূ নয় যার প্রভাবে ধনী হওয়ার প্রবৃদ্ধি বিশ্বের ১ম স্থানে, কোটিপতি হওয়ার সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি, সামাজিক বৈষম্যের চিত্র বিভীশিখাময় যা আমাদের জীবনে প্রভাব ফেলছে। অর্থনীতিতে গণতন্ত্র অর্থ সহজ-সবার জন্য সমান অধিকার ও সুযোগ, ন্যায্য বণ্টন এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত আর্থিক ব্যবস্থা। কে ব্যবসা করবে, কে ঋণ পাবে, কে চাকরি পাবে-এসব যেন রাজনৈতিক পরিচয়, ক্ষমতার নৈকট্য বা আনুগত্যের ওপর নির্ভর না করে। যোগ্যতা, পরিশ্রম ও উদ্যোগই হবে অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। ভোটাধিকার ফিরে এলেও মানুষের জীবনে কি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়, যদি তার জীবিকা, আয় ও সুযোগের অর্থনীতি আগের মতোই বৈষম্যপূর্ণ থাকে? বাস্তবতা হলো, রাজনৈতিক অধিকার আর অর্থনৈতিক অধিকার আলাদা করে দেখা যায় না। একজন নাগরিক যদি চাকরি না পান, ঋণ বা ব্যবসার সুযোগ রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর নির্ভর করে, তাহলে গণতন্ত্র তার কাছে কেবল ব্যালট বাক্সে সীমাবদ্ধ থাকে। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত আর্থিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ না হলে তার বোঝা পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর-কর বাড়ে, মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়। এই বাস্তবতায় ভোটাধিকার থাকলেও মানুষের দৈনন্দিন জীবন ক্রমেই কঠিন হয়ে ওঠে। অর্থনৈতিক গণতন্ত্র মানে সুযোগের সমতা প্রতিষ্ঠা করা। একজন কৃষক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বা তরুণ যেন শুধু পরিচয় বা যোগাযোগের অভাবে পিছিয়ে না পড়ে। সহজ শর্তে ঋণ, ন্যায্য সুদের হার, প্রযুক্তি ও বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা হলে অর্থনীতি বড় ব্যবসা ও প্রভাবশালীদের গণ্ডি পেরিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে। এতে কর্মসংস্থান বাড়ে, গ্রাম ও শহরের ব্যবধান কমে, মানুষের নিজস্ব সক্ষমতা বিকশিত হয়। ন্যায্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। কর-ব্যবস্থা ও সামাজিক নিরাপত্তা এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে এখনো প্রত্যক্ষ করের পরিধি সীমিত, কিন্তু ভোগ্যপণ্যে পরোক্ষ করের বোঝা সবার ওপর সমানভাবে পড়ে। ফলে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অর্থনীতিতে গণতন্ত্র মানে কর-ব্যবস্থায় ন্যায্যতা আনা-যাদের আয় বেশি, তাদের কর-দায়িত্বও বেশি হবে। পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি যেন প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশ প্রেক্ষিত পর্যালোচনা :
৮ আগস্ট ২০২৪ অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল গগনচুম্বী। তারা আশা করেছিল নতুন অন্তর্বর্তী সরকার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করবে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার করবে, অর্থনীতিকে গতিশীল করবে এবং মানুষের জীবনযাত্রার মানের উন্নয়ন ঘটাবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূণ চাওয়া ছিল একটি গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করে মানুষের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ করে দেওয়া এবং একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ফিরে আসা। একবছর অধিক সময় পর যদিও কয়েকটা অর্থনৈতিক সূচক কিছুটা উন্নতি করেছে, তবে অধিকাংশ সূচকই এখনো আগের দুর্বল অবস্থান থেকে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। সাধারণ মানুষের অভিযোগ, আয়ের তুলনায় জীবনযাত্রার ব্যয় এখন আগের চেয়ে বেশি। এমন পরিস্থিতিতে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির দোলাচলে ১২ই ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচন শেষ হয়েছে এবং একটি গণতন্ত্রিক কাঠামোতে দেশ পরিচালিত হবে। এখন আমাদের অপেক্ষা করতে হবে নির্বাচিত সরকার দেশের সামগ্রিক সমস্যাগুলোকে কতটুকু সমাধানে আগ্রহী হয়।

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *