বিশ্লেষণ দাবার ছক সাজিয়েছে ইরান-চীন!
প্রকাশ: ১৮ মার্চ ২০২৬
কূটনৈতিক ও সামরিক দুভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইরানের পাশে আছে চীন। এই যুদ্ধকে চীন একদিকে একটি রাজনৈতিক উত্তেজনা হিসেবে, অন্যদিকে একটি সামরিক হুমকি হিসেবে দেখছে। চীনের পক্ষ থেকে এর আগে স্পষ্টভাবেই বলা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র ‘যুদ্ধে আসক্ত’। দেশটির ২৫০ বছরের ইতিহাসে মাত্র ১৬ বছর শান্তিপূর্ণ ছিল। বেইজিং মনে করে, যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্টভাবে একটি বৈশ্বিক হুমকি। যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, চীন ইরানে যুদ্ধের নিয়মও বদলে দিয়েছে। ইরানের সঙ্গে মিলে চীন একটি দাবার ছক সাজিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। দ্য ক্র্যাডলের এক বিশ্লেষণে এসব কথা উঠে এসেছে।
ইরান এখন চীনের বাইদু নেভিগেশন স্যাটেলাইট সিস্টেম বা জিএনএসএসের সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে যুক্ত। জিএনএসএস হলো চীনের নিজস্ব জিপিএসের মতো একটি নেভিগেশন ব্যবস্থা। যা পৃথিবীর যে কোনো জায়গায় কোনো কিছুর অবস্থান, গতি ও সময় নির্ধারণ করতে সাহায্য করে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোটের প্রতিটি পদক্ষেপ চীনের প্রযুক্তিতে ধরা পড়ে। কক্ষপথে থাকা চীনের ৪০টিরও বেশি বাইদু স্যাটেলাইট এই কাজে সহায়তা করে। ফলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র এখন নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে এবং শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে।
ইরান ও চীনের মধ্যে ২৫ বছরের ব্যাপক কৌশলগত অংশীদারিত্বের অংশ হিসেবে তেহরান এই সহায়তা পাচ্ছে। চীন ইরানকে তাদের স্যাটেলাইট সিস্টেমের সঙ্গে সমন্বিত দূরপাল্লার রাডারও সরবরাহ করেছে। ফলে গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধের তুলনায় ইরানের প্রতিক্রিয়া জানানোর টাইমিং (সময়) এই যুদ্ধে বদলে গেছে।
রাশিয়াও ইরানকে সমান্তরালভাবে সাহায্য করেছে। ফলে ইরান ইউক্রেনে প্যাট্রিয়ট ও আইআরআইএসটির মতো পশ্চিমা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রয়োগ করতে পারছে। এটা শুধু ড্রোন ছোড়ার কৌশল নয়; বরং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে ড্রোনের ঝাঁক ছুড়ে দেওয়ার রুশ পদ্ধতি কাজে লাগাচ্ছে তেহরান। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের বিরুদ্ধে এই কৌশলই ইরানকে যুদ্ধক্ষেত্রে বিধ্বংসী প্রমাণ করছে।
হরমুজ প্রণালিতে এখন যা ঘটছে তা হলো, ইরান শুধু সেই সব তেল ট্যাঙ্কারকে ট্রানজিটের অনুমতি দিচ্ছে, যাদের কার্গোর মূল্য পেট্রো-ইউয়ানে পরিশোধ করা হয়েছে। কোনো ডলার কিংবা ইউরো নয়, শুধু ইউয়ান। প্রকৃত পক্ষে, চীন ২০২২ সালের ডিসেম্বরেই পেট্রোডলার ব্যবস্থার (ডলার ছাড়া তেল বেচাকেনা নয়) অবসান ঘটানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছিল। বেইজিং গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলের (জিসিসি) দেশগুলোকে সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জে তেল ও গ্যাস বাণিজ্য করার জন্য আমন্ত্রণ জানায়। এসবের সঙ্গে চীনের পঞ্চদশ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাকে যুক্ত করলে সবকিছু স্পষ্ট হয়ে যায়।
ইরান এখন বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংকীর্ণ জলপথে পেট্রোডলারের পরিবর্তে পেট্রোইউয়ান চালু করে চীনকে আধিপত্যের মাঠ সাজিয়ে দিচ্ছে। এই জলপথ দিয়েই বিশ্বের মোট তেলের ২০ শতাংশ চলাচল করে। তেহরানের প্রায় ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল রপ্তানির নিষ্পত্তি হয় ইউয়ানে। এতে চীনের সিআইপিএস পেমেন্ট সিস্টেম ব্যবহার করা হয়। আর এই পদ্ধতির গ্রাহক মূলত গ্লোবাল সাউথের (উন্নয়নশীল) দেশগুলো।
গভীর ও সমন্বিত কৌশল প্রয়োগ বেইজিংয়ের
বেইজিংয়ের পরিকল্পনাবিদরা গভীর ও পদ্ধতিগত দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবায়নে দীর্ঘ বছর ধরে কাজ করছেন। এই কাজে তারা জিডিপি প্রবৃদ্ধি, ডিজিটাল অর্থনীতির উন্নতি, সবুজ জ্বালানি সমাধান কাজে লাগানো, ভূপৃষ্ঠের পানির গুণমান ব্যবহার এবং বিপুল পরিমাণ উচ্চমূল্যের পেটেন্টের (উদ্ভাবনের আইনি সুরক্ষা) দিকে নজর দিয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ২০৩০ সাল পর্যন্ত অর্জনযোগ্য কঠোর লক্ষ্যমাত্রা।
এর অর্থ হলো, চীনারা অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, পরিবেশ, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবাকে একই সুস্থ দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মতো বিবেচনা করছে। তাদের সর্বশেষ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাটি চূড়ান্তভাবে দেখায়, চীন কীভাবে আসন্ন প্রযুক্তিগত ভবিষ্যতের নেতা হওয়ার জন্য সুপরিকল্পিতভাবে কাজ করছে। এর ব্যাপ্তি ২০৩০ সাল ছাড়িয়ে এই শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত বিস্তৃত।
