উচ্চ খেলাপির কারণে লভ্যাংশ দিতে পারবে না অর্ধেক ব্যাংক
প্রকাশ: ১৮ মার্চ ২০২৬
কোনো ব্যাংকে খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশ বা তার বেশি থাকলে যতই মুনাফা হোক ওই ব্যাংক এবার লভ্যাংশ দিতে পারবে না। হিসাব বছর শেষের তথ্যের ভিত্তিতে এই হিসাব হবে। গত হিসাব বছরের ডিসেম্বর শেষে সরকারি-বেসরকারি খাতের ২৯টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ রয়েছে দুই অঙ্কের ঘরে। এ সংখ্যা মোট তপশিলি ব্যাংকের প্রায় অর্ধেক। এর মধ্যে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ১৭টি ব্যাংক এবার শুধু উচ্চ খেলাপির কারণে লভ্যাংশ দিতে পারবে না। আবার মূলধন ও প্রভিশন ঘাটতি থাকা ব্যাংক গত বছর থেকে লভ্যাংশ দিতে পারছে না। শুধু এই বিধানের কারণে গত বছর অনেক ব্যাংক লভ্যাংশ দিতে ব্যর্থ হয়েছিল।
ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি শক্ত করতে ড. আহসান এইচ মনসুর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর থাকা অবস্থায় গত বছরের ১৩ মার্চ ‘শেয়ারের বিপরীতে লভ্যাংশ ঘোষণার নীতিমালা’ শীর্ষক এ বিধান করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২০ সালে করোনার পর থেকে লভ্যাংশ বিতরণে বিধিনিষেধ দিয়ে আসছে। মূলত ওই সময় কিস্তির এক টাকা আদায় না হলেও ঋণ নিয়মিত দেখানোর বিধানের কারণে কিছুটা কড়াকড়ি করা হয়। তবে এতদিন কেবল প্রভিশন সংরক্ষণে ডেফারেল তথা বাড়তি সময় নেওয়া ব্যাংকের লভ্যাংশ বিতরণের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ ছিল। ডেফারেলের পাশাপাশি ২০২৫ সালের জন্য লভ্যাংশ বিতরণে নতুন করে অনেক ধরনের শর্ত যুক্ত করা হয়েছে।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যবসায়ী মোস্তাকুর রহমানকে গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে লভ্যাংশ বিতরণের নীতিমালায় কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। ব্যাংকের দিক থেকেও এ নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আপত্তি তোলা হয়নি। সাধারণভাবে একটি হিসাব বছর শেষ হওয়ার সর্বোচ্চ চার মাসের মধ্যে আর্থিক বিবরণী চূড়ান্ত করতে হয়। লভ্যাংশের পাশাপাশি কর্মীদের উৎসাহ বোনাসের ক্ষেত্রেও এবার নিয়ম কঠোর করা হয়েছে। তবে এবার এই নিয়মের শিথিলতা চেয়েছে ব্যাংকগুলো। কোনো ব্যাংক নিট মুনাফা করতে না পারলেও কর্মীদের উৎসাহ বোনাস দেওয়ার সুযোগ চেয়ে সম্প্রতি গভর্নরের কাছে অনুরোধ জানায় ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিএবি। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি।
লভ্যাংশ দিতে পারবে না যেসব ব্যাংক দেশে বর্তমানে ৬১টি তপশিলি ব্যাংক রয়েছে। এর মধ্যে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত রয়েছে ৩৬টি ব্যাংক। অবশ্য সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠিত হয়েছে যে পাঁচ ব্যাংক মিলে এখনও আলাদাভাবে তাকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হিসেবে দেখানো হচ্ছে। শুধু উচ্চ খেলাপি ঋণের কারণে এর মধ্যে ১৭টি ব্যাংক এবার লভ্যাংশ দিতে পারবে না।
সরকারি ৯টি ব্যাংকের মধ্যে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কেবল রূপালী ব্যাংক। ব্যাংকটির ১৯ হাজার ৬৩১ কোটি টাকা বা মোট ঋণের ৪১ দশমিক ৫৮ শতাংশ খেলাপি। অবশ্য সরকারি অন্য সব ব্যাংকেরও খেলাপি ঋণ দুই অঙ্কের ওপরে। সরকারি ব্যাংকের মধ্যে সর্বোচ্চ ৭২ হাজার ১৫২ কোটি টাকা বা মোট ঋণের ৭৪ শতাংশ খেলাপি জনতা ব্যাংকের।
বেসরকারি খাতের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি সর্বোচ্চ। পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে ইউনিয়ন ব্যাংকের মোট ঋণের ৯৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ খেলাপি। এর পরে রয়েছে যথাক্রমে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ৯৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ, গ্লোবাল ইসলামী ৯৬ দশমিক ২৭ শতাংশ, এসআইবিএল ৮০ দশমিক ৩৮ এবং এক্সিম ব্যাংক ৬২ দশমিক ৪৫ শতাংশ।
সমস্যাগ্রস্ত আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের ৮৪ শতাংশ ঋণ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। আইএফআইসি ব্যাংকের মোট ঋণের ৫৩ দশমিক ১২ শতাংশ, ন্যাশনাল ব্যাংকের ৫১ দশমিক ৯৯ শতাংশ ও এবি ব্যাংকের ৫০ দশমিক ৮৮ শতাংশ ঋণ খেলাপি।
খেলাপি ঋণের হারে এর পরের অবস্থানে থাকা ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের ৯২ হাজার ১১৫ কোটি টাকা বা ৪৯ দশমিক ৩৪ শতাংশ খেলাপি। প্রিমিয়ার ব্যাংকের ৩০ দশমিক ৪৪ শতাংশ, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ২২ দশমিক ৪৬ শতাংশ, এনআরবিসি ব্যাংকের ১৭ দশমিক ১১ শতাংশ, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের ১৫ দশমিক ৮৩ শতাংশ, সাউথ বাংলা অ্যাগ্রিকালচার ব্যাংকের ১৫ দশমিক শুন্য ৪, ওয়ান ব্যাংকের ১৩ দশমিক ৪৯ ও ইউসিবির ১১ দশমিক ৬৯ শতাংশ খেলাপি। অবশ্য ব্যাংক খাতে বর্তমানে শতাংশ বিবেচনায় ৯৮ দশমিক শতাংশ খেলাপি ঋণ রয়েছে বিদেশি মালিকানার ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের।
