মধ্যপ্রাচ্য সংকট প্রবাসী আয় কমার আশঙ্কা বাংলাদেশ ব্যাংকের

প্রকাশ: ১৮ মার্চ ২০২৬

জুলাই আন্দোলনে সরকার বদলের পর প্রবাসী আয়ে (রেমিট্যান্স) যে নতুন জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে, তা নিকট ভবিষ্যতে বহাল থাকবে বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে এ ধারা বজায় থাকবে কিনা, তা নির্ভর করবে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাতকে কেন্দ্র করে যে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে, তা প্রশমনের ওপর।

অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকের রেমিট্যান্স আয়বিষয়ক ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে এমন শঙ্কার কথা বলেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রতিবেদনটি গতকাল মঙ্গলবার ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে প্রবাসী আয় কমে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই বর্তমান প্রবৃদ্ধির ধারা ধরে রাখতে ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং শ্রমবাজারের বৈচিত্র্যকরণ জরুরি বলে মত দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংক প্রবাসী আয়ের ধারা বজায় থাকা নিয়ে এমন সময় এ শঙ্কা ব্যক্ত করেছে, যখন সাম্প্রতিক কয়েক বছরের মধ্যে প্রবাসী আয়ে বড় ধরনের জোয়ার বইছে। গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত টানা তিন মাস তিন বিলিয়নের বেশি রেমিট্যান্স এসেছে।  মধ্যপ্রাচ্য সংকটের মধ্যেও এ ধারা অব্যাহত রয়েছে। চলতি মার্চের প্রথম ১৪ দিনে প্রবাসীরা ২২০ কোটি ডলারের বেশি রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। এর আগে কখনও দুই সপ্তাহে এত বেশি রেমিট্যান্স আসেনি। গত বছরের মার্চের একই সময়ে যা ছিল ১৬২ কোটি ডলার। রেমিট্যান্সে উচ্চ প্রবৃদ্ধির ফলে বৈদেশিক মুদ্রার গ্রস রিজার্ভ বেড়ে ৩৪ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। আর বিপিএম-৬ অনুযায়ী দাঁড়িয়েছে ২৯ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার।

প্রবাসী আয় কমার  শঙ্কা প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে নতুন করে প্রবাসী শ্রমিকরা যেতে পারছেন না। এতে গত কয়েক বছর ধরে এ অঞ্চলে যে অভিবাসন হয়েছে, তা কমে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে চলা সংঘাতের কারণে বিমান চলাচল বন্ধ হওয়ায় অনেক বাংলাদেশি চাকরি সূত্রে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে যেতে পারছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, ইরান যুদ্ধের দ্রুত অবসান হলে প্রবাসী আয়ে যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার শঙ্কা আছে, তা সীমিত হতে পারে। তবে কোনো কারণে এ সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে আঞ্চলিক সংকট পুরো মধ্যপ্রাচ্য থেকে এ আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। তেমনটি হলে বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যের ওপর চাপ বাড়িয়ে দিতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্য থেকেই ৪৭% প্রবাসী আয়

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে ৪০৮ কোটি ২৪ লাখ মার্কিন ডলার প্রবাসী আয় এসেছে, যা এ সময়ের মোট প্রবাসী আয়ের প্রায় ৪৭ শতাংশ। একই সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো থেকে  ১৭০ কোটি ১১ লাখ মার্কিন ডলার (১৯ দশমিক ৬১ শতাংশ) এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে ১৩৫ কোটি ৩৪ লাখ মার্কিন ডলার (১৫ দশমিক ৬০ শতাংশ) রেমিট্যান্স এসেছে।

কম আসছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে
প্রবাসী আয় প্রবাহে সার্বিক ইতিবাচক চিত্র থাকলেও কিছু ক্ষেত্রে ভিন্ন ও উদ্বেগজনক চিত্র দেখা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধরনের পতন হয়েছে। আগের বছরের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে যেখানে ১৫৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা কমে নেমেছে ৬৫ কোটি ৮৫ লাখ
ডলারে। দেশটি থেকে রেমিট্যান্স আয় ৫৮ দশমিক ১৯ শতাংশ কমেছে।

গত ৫ বছরের অভিবাসন
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশ থেকে বিপুল সংখ্যক কর্মী বিদেশে গেছেন, যা রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ভিত্তি তৈরি করেছে। ব্যুরো অব ম্যানপাওয়ার এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড ট্রেনিংয়ের (বিএমইটি) তথ্য অনুসারে গত পাঁচ বছরে মোট ৫১ লাখ ৮৭ হাজার বাংলাদেশি চাকরি নিয়ে প্রবাসে গেছেন। এর মধ্যে ২০২১ সালে ছয় লাখ ১৭ হাজার ২০৯ জন, ২০২২ সালে ১১ লাখ ৩৫ হাজার ৮৭৩ জন, ২০২৩ সালে ১৩ লাখ ০৫ হাজার ৪৫৩ জন, ২০২৪ সালে ১০ লাখ ১১ হাজার ৯৬৯ জন এবং  ২০২৫ সালে ১১ লাখ ১৬ হাজার ৩৭৬ জন।
২০২৫ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে দুই লাখ ৯৩ হাজার ৪৭৪ জন বাংলাদেশি চাকরি নিয়ে বিদেশে গেছেন। এই বিশাল সংখ্যক কর্মীবাহিনী বর্তমানে বিদেশের শ্রমবাজারে কর্মরত আছেন, যা নিকট ভবিষ্যতে রেমিট্যান্স প্রবাহকে স্থিতিশীল রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *