শাহপরীর দ্বীপে

প্রকাশ: ০৭ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৬:৫৭

বঙ্গোপসাগর আর মিয়ানমারের সীমান্ত ঘেঁষে নাফ নদের মোহনা, সর্ব দক্ষিণে নৈসর্গিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ জনপদ শাহপরীর দ্বীপ। পাহাড়, নদী, সমুদ্রের মেলবন্ধন, জেলেদের জীবনযাত্রা–সব মিলিয়ে ভ্রমণপ্রেমীর জন্য আকর্ষণীয় স্থানটি নিয়ে লিখেছেন– মুহাম্মদ জাভেদ হাকিম শাহপরীর দ্বীপ। নামের মাঝেই যেন মিশে আছে ভ্রমণের মাদকতা। উত্তরে বাংলাবান্ধা। দক্ষিণে শাহপরীর দ্বীপ। দেশের শেষ সীমান্ত। ওপারেই মিয়ানমার। মাঝে বয়ে চলা নাফ নদ। সেন্টমার্টিনগামী চলাচলরত স্পিডবোট জেটিঘাটে দাঁড়ালে চোখ আটকায় সারি সারি পাহাড়ে। সেন্টমার্টিন যাওয়ার উদ্দেশে আমি আর নাজমুল একদিন ভোরে কক্সবাজারের ট্রেনে চেপে বসলাম। ট্রেন গন্তব্যে পৌঁছল বেলা প্রায় ৩টায়। কক্সবাজার স্টেশনের নান্দনিকতা যাত্রার সব ক্লান্তি ভুলিয়ে দিল। ঘুরে ঘুরে ছবি তুলমাম। সেখান থেকে অটোতে চড়ে সোজা কলাতলী দাওয়াত ঘরে গেলাম। পূর্ব পরিচিত স্থানীয় বাসিন্দা নুরুল আজীমের সঙ্গে দেখা করে ভ্রমণ পরিকল্পনা শেয়ার করে হোটেলে উঠলাম। রাতের মধ্যেই আমাদের চাহিদামতো ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেলের ব্যবস্থা হলো। সকালে নিজেই বাইক চালিয়ে মেরিন ড্রাইভ রোড দিয়ে যাত্রা শুরু করলাম। ভোরের শীতল হাওয়ায় সাগর সৈকতলাগোয়া সড়কে মোটরবাইক চালানোর আনন্দ এক ভিন্নরকম অনুভূতি দিচ্ছিল। যেতে যেতে পরীকুণ্ডর এলাকা দরিয়ানগর পার হতে হতে অপার্থিব আনন্দে মন ভরে গেল। এক পাশে ন্যাড়া পাহাড়, অন্য পাশে অথৈ নীল সাগর, মাঝখান দিয়ে ঝাউবন, গর্জন, পলাশ, শিমুল, কৃষ্ণচূড়া ও নারকেল গাছের ছায়াঘেরা পথে মোটরবাইক নিয়ে চলছিলাম। কী যে অপূর্ব লাগছিল!

টেকনাফ গেট পার হয়ে সাবরাং পেছনে ফেলে মুশকিল্লাপাড়ায় বিরতি নিয়ে নামলাম সৈকতে। নিঝুম পরিবেশ, চারপাশে ছিল না জনমানব। নীল সাগরের তীরে বিশাল বালিয়াড়িতে শুধু কয়েকজন জেলে জাল টানায় মহাব্যস্ত। সেখানে আগন্তুক হয়ে আমরা ঢুকে পড়লাম। উঠে এলো জাল। নানারকম সামুদ্রিক মাছে কিলবিল করছিল। এর মধ্যে ছুরি মাছই বেশি ছিল। আশ্চর্যের বিষয়, পুরো জালে একটাই ছিল চিংড়ি। সেটি দেখতেও অদ্ভুত সুন্দর। মনের আনন্দে মাছ নাড়াচাড়া করতে করতে সময়জ্ঞান ভুলে যাচ্ছিলাম।

একসময় শাহপরীর দ্বীপ থেকে কল এলো। দেরি না করে রওনা দিলাম। মনের আনন্দে গান গাইতে গাইতে একেবারে শাহপরীর দ্বীপের বাজারে গিয়ে পৌঁছালাম। অপেক্ষায় থাকা দ্বীপের বাসিন্দা ফারুকের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলো। চায়ের কাপে চুমুক শেষে প্রথমে চলে গেলাম ডেইলপাড়া। অনুমতি নিয়ে বাইক নিয়েই ঢুকে গেলাম জেটিঘাটে। অনেক দূর পর্যন্ত পাকা সেতু। দুপাশে নাফ নদের স্বচ্ছ টলটলে নীলাভ রঙা পানি। মিয়ানমারের সারি সারি পাহাড়ের হাতছানি। দৃষ্টির সীমানায় সাগরের বুক ফুটো করে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা সেন্টমার্টিন। সব মিলিয়ে অসাধারণ সৌন্দর্যে ঘেরা ডেইলপাড়া।
সন্ধ্যা নামলে রাতযাপনের জন্য ছুটতে গেলাম উত্তরপাড়ায়। ঠাঁই হলো না নিভৃত পল্লির কোনো বাড়িতে। এরপর চলে গেলাম নাফ নদ পেরিয়ে নয়াপাড়া। গিয়ে দেখলাম এলাহি কাণ্ড। ভ্রমণবান্ধব সালমা আক্তার নূর ডাউস সাইজের কালাচান্দা বিলিম্বি দিয়ে তরকারি রান্না করেছে। আহ্‌ কী যে স্বাদ!

পরের দিনের জন্য দ্রুত শুয়ে পড়লাম। ভোরে উঠেই রওনা হলাম ঘোলারচরের উদ্দেশে। নাফ নদের তীরঘেঁষা বালিতে বাইক চলছিল। এক পাশে ঢেউ, আরেক পাশে বিশালাকার ঝাউবন। লালকাঁকড়ার দৌড়ঝাঁপ। স্থানীয়রা বড়শি দিয়ে মাছ ধরছিল। আনমনে ভেজা বালিতে লিখি জীবন থেকে নেওয়া ছোটগল্প। জায়গাটা নাফ নদের মোহনা। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, ওপারেই মিয়ানমারের মংডু শহর। এখান থেকেও ভিনদেশের মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট-বড় পাহাড়গুলোর সৌন্দর্য চোখে পড়ার মতো।

এরপর গেলাম পশ্চিমপাড়া। চলতি পথে পরিচয় হলো স্থানীয় বাহরুল উলুম বড় মাদ্রাসার শিক্ষক জয়নুল আবেদীনের সঙ্গে। আমাদের সঙ্গে তিনিও গেলেন পশ্চিমপাড়া। সেখানে পৌঁছে উত্তাল সাগরে শত শত জেলের জাল টানায় দৃশ্য চোখে পড়ল। তাদের মধ্যে কেউ জাল থেকে মাছ ছাড়াতে ব্যস্ত, কেউবা মাছ তুলে ড্রামে ভরছিল। স্থানটি নানা রঙের পতাকাবাহী সাগরফেরত মাছ ধরার বড় বড় ট্রলারে পরিপূর্ণ। নামমাত্র মূল্যে এখান থেকে ছুরিসহ আরও কয়েক পদের মাছ নিলাম। এবার রান্নার পালা। জয়নুল ভাই আমাদের নিয়ে গেলেন মাঝেরপাড়ায়। গাছগাছালিতে ছায়াঘেরা চমৎকার একটি গ্রাম। বাড়ির উঠানে বসেই শোনা গেল সাগরের গর্জন। সেই গ্রামেরই এক গৃহিণী পরম যত্নে মাছগুলো রান্না করে খাওয়ালেন। মনে হলো, পুরো শাহপরীর দ্বীপ ঘুরে মাঝেরপাড়া পর্যন্ত না এলে সত্যিই রোমাঞ্চকর ভ্রমণের ষোলোকলা হয়তো পূর্ণতা পেত না।

যাতায়াত
ঢাকা থেকে সরাসরি বাসে যেতে পারেন টেকনাফ। সেখান থেকে যে কোনো হালকা যানবাহনে যাওয়া যায় শাহপরীর দ্বীপ।

থাকা-খাওয়া
এখানে সাধারণ মানের কিছু গেস্ট হাউস রয়েছে। খাবারের জন্যও বাজারে পেয়ে যাবেন নানা ধরনের রেস্টুরেন্ট।

You may also like...

No Responses

  1. Georgemidly says:

    হাই, আমি আপনার মূল্য জানতে চেয়েছিলাম.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *