অন্য আইনে বিশ্বের জন্য এবার ১৫% শুল্ক ট্রাম্পের

প্রকাশ: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

বিশ্বের প্রায় সব দেশের ওপর নতুন ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তা ৫ শতাংশ বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করেছেন। গতকাল শনিবার ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যম সোশ্যাল ট্রুথে এক পোস্টে শুল্ক বাড়ানোর কথা জানান। এর আগে শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট আমদানি পণ্যে ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপিত শুল্ক অবৈধ ঘোষণার পরপরই তিনি ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের নথিতে সই করেন। সেই সঙ্গে ট্রাম্প সর্বোচ্চ আদালতের ওই বিচারপতিদের কঠোর সমালোচনাও করেন। বিচারপতিরা ট্রাম্পের শুল্ক আরোপকে ‘জাতির জন্য অপমানজনক’ বলে অভিহিত করেছেন। নিউইয়র্ক টাইমস গতকাল লিখেছে, সুপ্রিম কোর্টের বাতিল করা কিছু শাস্তিমূলক শুল্কের পুনরাবৃত্তি করার পদক্ষেপ নেওয়ার এক দিন পর শনিবার ট্রাম্প বিশ্বব্যাপী শুল্ক ১৫ শতাংশে উন্নীত করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। পোস্টে তিনি বলেন, নীতিটি অবিলম্বে কার্যকর হবে। একটি বড় আইনি বাধা সত্ত্বেও বাণিজ্য যুদ্ধ চালিয়ে যাবেন বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।

দ্য গার্ডিয়ান অনলাইন জানায়, নতুন ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে ট্রাম্প পাঁচ দশকের বেশি সময় আগের একটি আইনের ধারাকে ফিরিয়ে আনেন। ট্রাম্প বলেন, অবিলম্বে ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ১২২ ধারার অধীনে শুল্ক বৃদ্ধির আদেশ কার্যকর হবে। পাশাপাশি আরও শুল্ক আরোপের অনুমতি দিয়ে অন্যায্য বাণিজ্য অনুশীলনের তদন্ত শুরু করবেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই বিদ্যমান আইনের অধীনে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা তাঁর রয়েছে। এর আগে সুপ্রিম কোর্ট যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পণ্যে ট্রাম্পের শুল্ক আরোপ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। আদালত জানান, ১৯৭৭ সালের একটি আইনের ধারার কথা উল্লেখ করে ট্রাম্প যে শুল্ক আরোপ করেছেন, সেটা অবৈধ। তাঁর এ এখতিয়ার নেই। এ ধরনের শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদন আবশ্যক। ট্রাম্প আদালতের এ রুল অস্বীকার করেন। গতকাল বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, আদালতের রায় ভিন্ন অর্থে তাৎপর্য বহন করে। নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি অব ল’র সাংবিধানিক আইন ও প্রেসিডেন্সিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ পিটার শেইন বলেন, ‘আদালত এটা দেখাতে চেষ্টা করেছেন– ট্রাম্পের সবকিছুকে আইনি বৈধতা দেওয়ার কাজ তারা করবেন না।’

নতুন শুল্কের ধরন কী
ট্রাম্প যে ১৫ শতাংশ শুল্ক নতুন করে আরোপ করলেন, তা এক ধরনের অস্থায়ী আমদানি শুল্ক। এটি কার্যকর হবে ২৪ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা ১ মিনিট থেকে। ওভাল অফিসে এ শুল্ক-সংশ্লিষ্ট নথিতে সইয়ের পর হোয়াইট হাউসই এর ব্যাখ্যা দিয়েছে। এক তথ্যপত্রে জানানো হয়, ট্রাম্প ‘১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ১২২ ধারার অধীনে তাঁর কর্তৃত্ব প্রয়োগ করে একটি অস্থায়ী আমদানি শুল্ক আরোপের ঘোষণায় সই করেছেন।’

ধারাটি আসলে কী
মার্কিন আইনপ্রণেতাদের আইনগত গবেষণা ও বিশ্লেষণে সহায়তা করে কংগ্রেসনাল রিসার্চ সার্ভিস। সংস্থাটি বলছে, ‘১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ১২২ ধারা প্রেসিডেন্টকে এমন ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেয়, যাতে প্রয়োজনে অস্থায়ী আমদানি সারচার্জ (শুল্ক) অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারেন।’ তবে আইনটি এ ধরনের শুল্কের ওপর সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট কেবল ‘১৫০ দিনের বেশি নয়’– এমন সময়ের জন্য এ শুল্ক আরোপ করতে পারেন। এ ছাড়া ‘১৫ শতাংশের বেশি’ শুল্ক আরোপ করা যাবে না।

কানাডা ও মেক্সিকো বাদ
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, উত্তর আমেরিকার বাণিজ্য চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতিবেশী কানাডা ও মেক্সিকোকে নতুন অস্থায়ী শুল্ক থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। গরুর মাংস, টমেটো ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পদার্থের মতো কিছু খাদ্য পণ্যও অব্যাহতির মধ্যে রয়েছে।

বিচার বিভাগের সঙ্গে বিরোধ
সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে শুল্ক আরোপ ট্রাম্প প্রশাসন ও বিচার বিভাগের মধ্যে দ্বান্দ্বিক অবস্থানকে ইঙ্গিত করে। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে রুল জারির পক্ষে ভোট দেন ছয় বিচারপতি; বিরোধিতা করেন তিনজন। রুলের পক্ষে থাকা বিচারপতিদের মধ্যে তিনজন তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টির মেয়াদে নিয়োগ পেয়েছিলেন। গতকাল শনিবার বিবিসি লিখেছে, রুল জারি ও আমদানি শুল্ক বাতিলের ঘটনাকে ‘ভয়ানক’ বলে বর্ণনা করেছেন ট্রাম্প। তাঁর বাণিজ্যনীতিকে প্রত্যাখ্যান করা ছয় বিচারপতিকে তিনি ‘বোকা’ বলেও বর্ণনা করেন। দীর্ঘ আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের বিকল্প রয়েছে, ভালো বিকল্প আছে। এটার চেয়েও শক্ত বিকল্প আছে।’ পরে তিনি নতুন শুল্ক ঘোষণা করেন। বিরোধিতা করা তিন রিপাবলিকান বিচারপতি প্রসঙ্গে বলেন, তাদের মনোনয়ন নিয়ে তিনি ‘অত্যন্ত লজ্জিত। তাদের দেশপ্রেম নেই, সংবিধানের প্রতিও তারা শ্রদ্ধাশীল নন।’

সুপ্রিম কোর্টের রুলে প্রভাব কেমন হবে
দ্য গার্ডিয়ান অনলাইন জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি পণ্যে ট্রাম্পের আরোপিত শুল্ক অবৈধ ঘোষণা করে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট যে সাহসী রায় দিয়েছেন, তাতে বৈশ্বিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা খুব দ্রুতই কেটে যাবে, এমনটা মনে করছেন না বিশ্লেষকরা। ব্রিটিশ চেম্বার অব কমার্সের বাণিজ্যনীতিবিষয়ক প্রধান উইলিয়াম বাইন বলেন, শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সম্পর্কে এ রুল স্পষ্ট ধারণা দিতে সক্ষম হলেও এটি বাণিজ্যের ঘোলাজল সামান্যই পরিষ্কার করতে পেরেছে। ইউরোপীয় কমিশনের মুখপাত্র ওলফ গিল বলেন, ‘মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের রুল বিষয়ে আমরা জেনেছি। এটাকে সতর্কভাবে পর্যালোচনা করছি। আমরা মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগে আছি। কারণ পদক্ষেপের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ থাকতে চাই।’

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *