স্কুলে ছুটি কমানোয় ক্ষোভ

প্রকাশ: ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৮:৪৪| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের মাধ্যমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক পর্যায়ের বিদ্যালয়গুলোতে বার্ষিক ছুটি কমানোর সিদ্ধান্তে ক্ষোভ ও বিরক্তি প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। ২০২৬ সালে পবিত্র রমজান মাসে ২১ দিন স্কুল খোলা রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। রোজার মধ্যেই পড়েছে অমর একুশে ফেব্রুয়ারি ও শহীদ দিবস। এ ছাড়া দিনটিতে সাপ্তাহিক ছুটি। বছরজুড়ে আরও কিছু ছুটি সাপ্তাহিক ছুটির দিনে পড়েছে। এ কারণে ঘোষিত শিক্ষাপঞ্জিতে এ দিনগুলো আলাদা ছুটির দিন হিসেবে দেখানো হয়নি। এ ছাড়া দু-একটি পুরোনো ছুটি বাতিল করায় চলতি বছরের তুলনায় ছুটি কমেছে ১২ দিন। তবে বিদ্যালয়ে রোজার ছুটি কমানো হলেও মাদ্রাসায় তা হয়নি।

গত রোববার শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রকাশিত ২০২৬ সালের ছুটির তালিকা অনুযায়ী মোট ছুটি ৬৪ দিন। চলতি বছর বিদ্যালয়গুলোতে বার্ষিক ছুটি ছিল ৭৬ দিন। ছুটি কমানোর সিদ্ধান্তকে ‘অবাস্তব’ ও ‘শিক্ষার্থীবান্ধব নয়’ বলে মন্তব্য করছেন সংশ্লিষ্টরা। এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন তারা।

অভিভাবকদের অভিযোগ, বছরের বড় একটি সময় শিক্ষার্থীরা কোচিং, প্রাইভেট পড়া ও পরীক্ষার চাপের মধ্যে থাকে। এর সঙ্গে ছুটি কমে যাওয়ায় শিশু ও কিশোরদের মানসিক চাপ আরও বাড়বে। রাজধানীর ধানমন্ডি সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক স্থপতি হামিদুল হক সমকালকে বলেন, শুধু পড়াশোনা নয়, সন্তানদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিও সরকার থেকে সমভাবে গুরুত্ব দেওয়া দরকার। পর্যাপ্ত ছুটি না থাকলে তারা বিশ্রামের সুযোগ পাবে না। ভিকারুননিনা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক রুদাবা রশীদ বলেন, ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে খেলার মাঠ নেই। শিশুরা স্কুলে যায় আর ঘরে এসে বন্দি থাকে। স্কুলের ছুটিগুলোতেই তাদের নিয়ে অভিভাবকরা গ্রামে বা অন্যান্য স্থানে বেড়াতে যান। সেই সুযোগটুকুও সীমিত করে দিয়ে পরবর্তী প্রজন্মকে উদ্যমহীন, বুদ্ধিহীন ‘রোবট’ বানানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

রাজধানীর নটর ডেম কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী কিশোর ক্লডিয়াস জানায়, সারাবছর ক্লাস, পরীক্ষা আর প্রাইভেট পড়ার মধ্যেই থাকতে হয়। ছুটির সময়টুকুই থাকে পরিবার ও নিজের জন্য। ছুটি কমে যাওয়ায় হতাশা লাগছে।

শিক্ষা প্রশাসন বলছে, আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষার কার্যকর দিবস বাড়ানোর লক্ষ্যেই ছুটি কমানো হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, দীর্ঘ ছুটির কারণে পাঠদান ব্যাহত হয় এবং সিলেবাস শেষ করতে শিক্ষকদের বাড়তি চাপ নিতে হয়।

তবে গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে. চৌধুরী সমকালকে বলেন, ছুটি কমিয়ে দেওয়া নয়, বরং ক্লাসরুমে পাঠদানের গুণগত মান বাড়ানো, শ্রেণিকক্ষে কার্যকর শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেওয়া জরুরি। অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউল কবির দুলুর আশা, শিক্ষা মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সবার মত বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষাবর্ষের ছুটির কাঠামো আরও বাস্তবসম্মত ও শিক্ষার্থীবান্ধব করবে।

তালিকা পর্যালোচনায় দেখা যায়, শবেমেরাজ, সরস্বতীপূজা, একুশে ফেব্রুয়ারি (শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস), মে দিবস, বুদ্ধপূর্ণিমা, পবিত্র আশুরা, শুভ জন্মাষ্টমী, মধুপূর্ণিমা ও শুভ মহালয়া উপলক্ষে ছুটি রাখা হয়নি। তবে এসব দিবসের বেশকিছু সাপ্তাহিক ছুটির দিনে পড়েছে।

২১ রমজান পর্যন্ত চলবে ক্লাস
চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করে আগামী ১৭ ফেব্রুয়ারি পবিত্র রমজান শুরু হতে পারে। তবে তালিকা অনুযায়ী রমজান ও ঈদুল ফিতরের ছুটি শুরু হবে ৮ মার্চ। সেই হিসাবে ২১ রমজান পর্যন্ত বিদ্যালয় খোলা থাকার সম্ভাবনা আছে।

চলতি বছর রোজা, দোলযাত্রা, স্বাধীনতা দিবস, জুমাতুল বিদা, শবেকদর ও ঈদুল ফিতর মিলিয়ে মোট ২৮ দিন ছুটি থাকলেও ২০২৬ সালে তা কমিয়ে ১৯ দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া ঈদুল আজহা ও গ্রীষ্মকালীন অবকাশ মিলিয়ে ১৫ দিন ছুটি থাকলেও আগামী বছর তা কমিয়ে ১২ দিন করা হয়েছে। শীতকালীন অবকাশও এক দিন কমানো হয়েছে।

মাদ্রাসার ছুটি ৭০ দিন
২০২৬ শিক্ষাবর্ষে রোজা ও ঈদ মিলিয়ে এক মাসের বেশি বন্ধ থাকবে মাদ্রাসা। তাদের মোট ছুটি ৭০ দিন। গত রোববার মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর বার্ষিক ছুটির তালিকা প্রকাশ করে। পবিত্র রমজান উপলক্ষে আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি মাদ্রাসায় ছুটি শুরু হবে। ২৭ মার্চ মাদ্রাসা খুলবে।

সংবর্ধনার জন্য রাস্তায় দাঁড় করানো নিষিদ্ধ
২০২৬ সালের শিক্ষাপঞ্জির নির্দেশনায় বলা হয়েছে, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য বা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সংবর্ধনা কিংবা পরিদর্শনের নামে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাস বন্ধ রাখা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ ছাড়া কারও প্রতি সম্মান দেখাতে শিক্ষার্থীদের রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রাখা যাবে না।
এতে আরও বলা হয়েছে, অর্ধবার্ষিক ও বার্ষিক পরীক্ষা সর্বোচ্চ ১২ কর্মদিবসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। সব পরীক্ষা গ্রহণ করতে হবে এবং বার্ষিক পরীক্ষার উত্তরপত্র এক বছর সংরক্ষণ করতে হবে। পরীক্ষার নির্ধারিত তারিখ পরিবর্তন করা যাবে না। বিশেষ প্রয়োজনে তারিখ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) অনুমতি নিতে হবে।

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *