সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান পিএসসি খসড়ায় শ্রমিক স্বার্থ উপেক্ষিত হওয়ার শঙ্কা
প্রকাশ: ০৭ জানুয়ারি ২০২৬ | ১২:৩৪
বাংলাদেশের সমুদ্র এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য প্রণীত উৎপাদন-অংশীদারি চুক্তি (পিএসসি) খসড়া পর্যালোচনায় শ্রমিকদের স্বার্থ উপেক্ষিত হওয়ার শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। শ্রমিকদের জন্য আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক ‘শ্রমিক মুনাফা অংশগ্রহণ তহবিল’ (ডব্লিউপিপিএফ) চুক্তিপত্র থেকে বাদ দেওয়া হতে পারে বলে সূত্র জানিয়েছে। আগামী ১৫ জানুয়ারির মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়া কথা রয়েছে। ২০০৬ সালের শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন আইন অনুসারে, দেশের সব কোম্পানি তাদের লাভের নির্দিষ্ট অংশ এ তহবিলে জমা দিতে বাধ্য। এ অর্থ দিয়ে শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণমূলক নানা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। বিশেষ করে বহুজাতিক ও দেশীয় কোম্পানিগুলো প্রতিবছর নিয়ম মেনে এ তহবিলে অর্থ দিয়ে আসছে। পিএসসি খসড়ায় শ্রমিকদের জন্য এ তহবিল থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে। বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আক্তার বলেন, শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় এ তহবিল বাধ্যতামূলক। পিএসসির সঙ্গে আইন লঙ্ঘন করে শ্রমিকদের অংশ বাদ দেওয়া হলে তা শ্রমিক স্বার্থবিরোধী হবে। এটা শ্রমিকদের অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করবে এবং আন্তর্জাতিকভাবে দেশের শ্রমনীতি ও মানবাধিকার অবস্থানের জন্যও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তিনি বলেন, কোনো এক বা দুই কোম্পানির জন্য যদি বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়, তাহলে সবার জন্য তা প্রযোজ্য করতে হবে। এতে সরকারের রাজস্ব আয়ে প্রভাব পড়লেও শ্রমিকদের স্বার্থ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। পিএসসি পর্যালোচনা কমিটির সদস্য অধ্যাপক ড. ম তামিম বলেন, ‘পিএসসিতে শ্রমিক মুনাফা অংশগ্রহণ তহবিল থাকবে কি থাকবে না, তা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সিদ্ধান্তের বিষয়। আমরা ১৫ জানুয়ারির মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার চেষ্টা করছি, তাতে এই বিষয়ে সুপারিশ থাকবে কিনা তা চূড়ান্ত হয়নি।’
আইন অনুযায়ী, ডব্লিউপিপিএফ থেকে সরকারের জন্য ১০ শতাংশ অর্থ সরকারি শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে এবং ১০ শতাংশ কর্মচারী কল্যাণ তহবিলে যায়। বাকি ৮০ শতাংশ কর্মচারীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়, যার মধ্যে ৩০ শতাংশ আয়কর হিসেবে আদায় হয়। তহবিলগুলো শ্রমিকদের কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।খাত সংশ্লিষ্টরা বলেন, শ্রমিক কল্যাণে ডব্লিউপিপিএফ তহবিল খুবই প্রয়োজনীয়। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার নির্দেশনা অনুসারে শ্রমিক অধিকার সুরক্ষায় এই তহবিলের গুরুত্ব অপরিসীম। তাদের মতে, খসড়া পিএসসিতে বিদেশি কোম্পানিগুলোকে করমুক্ত সুবিধা, আমদানি শুল্ক অব্যাহতি এবং সম্পূর্ণ ব্যয় পুনরুদ্ধারের সুযোগ দেয়া হয়, যা বিনিয়োগবান্ধব হিসেবে বিবেচিত। তবে এসব সুবিধার বিপরীতে শ্রমিকদের কল্যাণ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার চেষ্টা করা হলে তা শ্রমিকদের অধিকার হরণ ছাড়া কিছু নয় বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। খাত সংশ্লিষ্টরা আরও বলছেনন, বিদেশি গ্যাস কোম্পানিগুলো এমন অঞ্চলে বিনিয়োগ পছন্দ করে যেখানে ঝুঁকি কম এবং মজুক প্রমাণিত থাকে। তাই ডব্লিউপিপিএফ তহবিল থেকে অব্যাহতি দিয়ে বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব নয়, বরং শ্রমিকদের অধিকার ক্ষুণ্ন হয়।
পিএসসি কাঠামো বিনিয়োগবান্ধব
ঠিকাদাররা প্রাথমিক উৎপাদন থেকেই গ্যাস অনুসন্ধান, উন্নয়ন ও পরিচালন সংক্রান্ত সব খরচ পুনরুদ্ধার করতে পারেন। ঠিকাদারের করপোরেট আয়কর সরকারের পক্ষ থেকে পরিশোধ করা হয়। অন্য কোনো করপোরেট প্রতিষ্ঠান এই সুবিধা পায় না। কার্যক্রমে ব্যবহার করা সব যন্ত্রপাতি, সরঞ্জাম ও উপকরণ শুল্ক ও করমুক্তভাবে আমদানি করা যায়, ফলে প্রাথমিক মূলধনী ব্যয় কম হয়। ২০১২ সালে সমুদ্র জয়ের পর এখন পর্যন্ত সমুদ্রে তেল গ্যাস অনুসন্ধান শুরু করা যায়নি। দেশের মধ্যে সিদ্ধান্তহীনতা এবং আন্তর্জাতিক নানা ঘটনা এর জন্য দায়ী।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনার সময় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কম থাকলেও বিনিয়োগ থেমে ছিল। আর করোনা পরবর্তী আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিনিয়োগে আগ্রহী হয়নি আন্তর্জাতিক তেল গ্যাস উত্তোলনকারী কোম্পানিগুলো। এর আগে সাতটি কোম্পানি দরপ্রস্তাব কিনলেও একটি কোম্পানিও দরপ্রস্তাব জমা দেয়নি। বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশের সমুদ্রে আইওসিদের অনীহার প্রধান কারণ ডব্লিউপিপিএফ এর সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।
বাংলাদেশের সমুদ্র এলাকা এখনও একটি ফ্রন্টিয়ার বেসিন। যেখানে আধুনিক সিসমিক ডেটা সীমিত। দ্বিমাত্রিক ও ত্রিমাত্রিক সিসমিক জরিপ অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগে আগ্রহ কমে যায়। আইওসিগুলোর মধ্যে এমন অঞ্চল বেছে নেয়, যেখানে প্রমাণিত মজুত, কম ঝুঁকি বা অত্যন্ত উচ্চ রিটার্নের সম্ভাবনা রয়েছে। এই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার বাজারে বাংলাদেশকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানে বিদেশি কোম্পানি না পাওয়ার প্রধান কারণ শ্রমিক কল্যাণে লাভের অংশ দেওয়া নয়। কারণ, এটি লাভ-পরবর্তী, সামাজিকভাবে দায়িত্বশীল ব্যবস্থা, যা বিনিয়োগ বা পরিচালনায় কোনো অতিরিক্ত বোঝা না চাপিয়ে জাতীয় রাজস্ব, শ্রমিক কল্যাণ এবং অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করে। প্রকৃত চ্যালেঞ্জগুলো হলো- অফশোর অনুসন্ধানের স্বাভাবিক উচ্চ ঝুঁকি, বৈশ্বিক মূলধন প্রতিযোগিতা এবং পর্যাপ্ত তথ্যের অভাব।
