খেজুর বাগান ‘রসের গ্রাম’ জগদীশপুর

প্রকাশ: ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৮:৪২

গাছের প্রতি ভালোবাসা সবারই আছে। তবে অনেকে জীবনভর ফলের গাছ লাগিয়ে তৃপ্তি পান, কেউবা পরিবেশ দূষণ রোধে সবুজায়ন করতে ভালোবাসেন। রংপুরের মদনমোহন বর্মণ এমনই একজন। ছোটবেলায় সারি সারি খেজুর গাছের সৌন্দর্য তাঁর মন কেড়েছিল। এক সময় চিন্তা করেন তিনিও খেজুর গাছের বাগান করবেন, পরিবেশের সৌন্দর্য বাড়াবেন। পরিকল্পিত সেই খেজুর বাগানই এখন তাঁর বড় অর্থনৈতিক উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। রস বিক্রি করে আয় করেন। তাঁর কারণেই রংপুর সিটি করপোরেশনের ১০ নম্বর ওয়ার্ডের জগদীশপুর গ্রাম এখন পরিচিতি পেয়েছে ‘রসের গ্রাম’ নামে।

আশির দশকে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যকার তিস্তা চুক্তি নিয়ে হইচই চলছিল। মদনমোহন জানতে পারেন, তিস্তা সমস্যার সমাধান না হলে এক সময় উত্তরবঙ্গ মরুভূমি হয়ে যাবে। এতে খেজুর গাছের প্রতি আরও দুর্বল হয়ে পড়েন তিনি। এ ছাড়া জানতে পারেন, মরুর দেশে খেজুর গাছই কেবল মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে।

স্বপ্ন বাস্তবায়নে তিনি নিজের জমিতে শতাধিক খেজুর গাছ লাগান। তখন ভাবেননি, এটাই একদিন তাঁর আয়ের পথ দেখাবে। গ্রামের মধ্যখানে শতাধিক গাছ মাথা উঁচু করে একদিকে শোভাবর্ধন করছে, পাশাপাশি বছর দশেক ধরে খেজুরের রস আহরণ করছেন মদনমোহন।

শীত মৌসুমে দূরদূরান্ত থেকে লোকজন আসেন রস কিনতে। তারা বাগানের সৌন্দর্য উপভোগও করেন। ধীরে ধীরে গ্রামটি এখন ‘রসের গ্রাম’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। তাঁর এই খেজুর বাগানের পরিচর্যায় অন্তত ১০ জনের কর্মসংস্থান হয়েছে। ১৯৮১ সালে এসএসসি পাসের পর রংপুর সরকারি কলেজে ভর্তি হলেও আর এগোতে পারেননি। বাড়িতে ফিরে এক একর ৬১ শতক জমি কিনে পুকুর খননসহ সারি করে রোপণ করেন খেজুরের চারা। সময়ের ব্যবধানে তাঁর বাগানের সৌন্দর্য ছড়িয়ে পড়ে লোকমুখে।

তবে অর্থনৈতিক সুফল পেতে অপেক্ষা করতে হয়েছে অন্তত ২০ বছর। ২০১৫ সালে রস আহরণ শুরু করেন মদনমোহন। চলতি বছর ৬০টি গাছের রস নামানো হচ্ছে। গাছপ্রতি প্রতিদিন ছয় থেকে সাত লিটার রস পাওয়া যায়। প্রতি লিটার রসের দাম ১২০ টাকা। দূরদূরান্ত থেকে ভোরবেলায় বাগানে এসে লোকজন টাটকা রস কিনে নিয়ে যায়। এ ছাড়া বিভিন্ন এলাকায় চাহিদা অনুযায়ী রস পৌঁছে দেওয়া হয়। এর পরও বাড়তি রস থাকলে তা দিয়ে বাড়িতেই তৈরি করা হয় গুড়। প্রতি কেজি গুড় বিক্রি হয় ৫০০ টাকা।

মৌসুমে (চার মাস) মদনমোহন খেজুরের রস-গুড় বিক্রি করেন চার লাখ টাকার, যা তাঁর আয়ের একমাত্র উৎস।
‎সরেজমিন দেখা যায়, গাছে গাছে ঝুলছে রসের পাত্র। বাদুড় বা অন্য কোনো পাখি যাতে রসে মুখ না দেয়, সে জন্য নেটের জালে ঢেকে দেওয়া হয়েছে পাত্র। পুব আকাশে কুয়াশা ভেদ করে যখন সূর্য উঁকি দেয়, ঠিক তখনই রসের পাত্র হাতে খেজুর বাগানে ছুটে আসেন মদনমোহন।

হাজিরহাট এলাকা থেকে আসা দুই বন্ধু সিয়াম ও হামিদুল বলেন, শীতের সকালে গাছ থেকে নামানো টাটকা খেজুরের রস খাওয়ার মজাই আলাদা। মদনমোহন কাকুকে ‘রসমোহন কাকু’ বলে ডাকি। সিও বাজার এলাকার তৌফিকুর রহমান বলেন, বাজারে কেনা রসের বিশ্বাস নেই। তাই প্রায়ই এখান থেকে রস নিয়ে যাই।
এলাকার বাসিন্দা একরামুল হক বলেন, ‘মদনমোহনের খেজুর বাগানের কারণেই জগদীশপুর গ্রামকে এখন ‘রসের গ্রাম’ বলে চেনে মানুষ।
উদ্যোক্তা মদনমোহন বলেন, বাগানে পাহারাদার, গাছি ও সহকারী মিলে ১০ জনের কর্মসংস্থান হয়েছে। খেজুর গাছ পুকুরপাড়ে কিংবা ক্ষেতের আইলেও লাগানো যায়। তিনি প্রত্যেককে দু-চারটি করে খেজুর গাছ রোপণের পরামর্শ দেন।

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *