যুদ্ধের অজুহাতে সয়াবিন তেলের দামও বেড়েছে

প্রকাশ: ০৮ মার্চ ২০২৬

রাজধানীর বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহে কিছুটা ঘাটতি তৈরি হয়েছে। বাজারে বেশির ভাগ দোকানে বোতলজাত তেল কম দেখা গেছে। আবার মহল্লার কোনো কোনো দোকানে তাও মিলছে না। সপ্তাহখানেকের ব্যবধানে খোলা তেলের দাম লিটারে বেড়েছে চার থেকে সাত টাকা। ফলে বিপাকে পড়েছেন সাধারণ ভোক্তারা।

তাদের অভিযোগ, বৈশ্বিক যুদ্ধের অজুহাতে রমজান ও ঈদ সামনে রেখে বোতলজাত সয়াবিন তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়াচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। গতকাল শনিবার রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মহাখালীসহ কয়েকটি বাজার ঘুরে ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

খুচরা ব্যবসায়ীরা জানান, যুদ্ধের সুযোগ নিতে কোম্পানিগুলো দাম বাড়ানোর উদ্দেশ্যে সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। ডিলার পর্যায়ে বেড়েছে বোতলজাত তেলের দাম। এতে খোলা তেলের বাজারে বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়েছে। তাছাড়া ক্রেতাদের অনেকেই যুদ্ধের আতঙ্কে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি কিনছেন। এভাবে যদি আরও দু-তিন দিন তেলের বাজারে টানাপোড়েন থাকে, তাহলে ভোক্তা পর্যায়ে দাম আরও বাড়তে পারে।

­তবে আমদানিকারক ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কেউ কেউ বলছেন, ডিজেল সংকটে তেলবাহী পরিবহন পাওয়া মুশকিল হয়ে পড়ছে। এ কারণে তেল সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটছে। তাছাড়া বিশ্ববাজারের সাম্প্রতিক সময়ে তেলের দাম বেড়েছে। এর কিছুটা প্রভাব পড়েছে বাজারে। ২০২২ সালে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ভোজ্যতেলের বাজারে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে কয়েক বছর ধরে রোজার সময় ও ঈদের আগে বাজারে ভোজ্যতেলের এক প্রকার কৃত্রিম সংকট তৈরি হতে দেখা গেছে। এবারও একই চিত্র রয়েছে। এর সঙ্গে খুচরা, ডিলার বা পাইকারি, আমদানিকারকসহ সব পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে।

প্রায় সপ্তাহ দুয়েক ধরে বাজারে বোতলজাত তেলের সরবরাহ কম। তবে তিন-চার দিন ধরে রাজধানীর খুচরা বাজারগুলোতে বিশেষ করে সবচেয়ে বেশি চাহিদাসম্পন্ন পাঁচ লিটারের বোতলের সরবরাহ একেবারে কমে গেছে। কয়েকজন খুচরা ব্যবসায়ী জানান, বাজারে সবচেয়ে চাহিদা বেশি থাকে পাঁচ লিটারের বোতলের। যার সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ৯৫৫ টাকা। সপ্তাহখানেক আগেও ডিলার থেকে খুচরা ব্যবসায়ীরা পাঁচ লিটারের বোতল কিনতে পারতেন ৯২০ টাকা করে। তারা ভোক্তাদের কাছে বিক্রি করতেন ৯৩০ থেকে ৯৫০ টাকা দরে। কিন্তু এখন খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে ৯৪০ থেকে ৯৫০ টাকা। ফলে ভোক্তাদের কাছে তারা ৯৫৫ টাকায় বিক্রি করছেন। তবে এভাবে দু-তিন দিন তেলের সংকট থাকলে ভোক্তা পর্যায়ে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করা ছাড়া উপায় থাকবে না বলে জানান ছোট ব্যবসায়ীরা।

যে অভিযোগ তুলছেন খুচরা ও ডিলাররা
কারওয়ান বাজারের আব্দুর রব স্টোরের স্বত্বাধিকারী মো. নাঈম বলেন, পাঁচ কার্টন (বোতলজাত) তেল চাইলে ডিলাররা দেন এক কার্টন। ডিলাররা দামও বাড়িয়েছেন লিটারে তিন থেকে চার টাকা করে।মহাখালী কাঁচাবাজারের মাসুমা স্টোরের স্বত্বাধিকারী মো. আল-আমীন বলেন, কয়েক দিন ধরে বোতল কম দিচ্ছে কোম্পানিগুলো। অন্যদিকে, যুদ্ধের কারণে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। যারা আগে একটি বোতল কিনতেন, তারা এখন দুটি চান। সংকটের এটাও একটা কারণ। সরবরাহ কমার কারণে দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন বলে জানান ডিলাররা। কোম্পানি পর্যায়ে বাড়েনি, কিন্তু ডিলার পর্যায়ে দাম বেড়েছে কেন জানতে চাইলে কারওয়ান বাজারের তীর ব্র্যান্ডের ডিলার এটিএন এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. সেলিম বলেন, তীরের তেলের বেশ সংকট রয়েছে। শনিবার মাত্র ৫০ কার্টন তেল পেয়েছেন তিনি। যেখানে স্বাভাবিক সময়ে দুই থেকে আড়াইশ কার্টন তেল পেতেন। এই পাইকারি তেল ব্যবসায়ী বলেন, চার-পাঁচ দিনের মধ্যে সরবরাহ বাড়বে বলে কোম্পানির পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে। তখন বাজার স্বাভাবিক হয়ে যাবে।

কী বলছেন আমদানিকারকরা
কোম্পানিভেদে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য জানা গেছে। সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার বিষয়ে টি কে গ্রুপের পরিচালক শফিউল আথহার তাসলিম সমকালকে জানান, পরিবহন সংকটে ভোজ্যতেল সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। পণ্যবাহী ট্রাক চাহিদামতো ডিজেল পাচ্ছে না। সে জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোও ট্রাকের সংকটে বিভিন্ন স্থানে তেল পৌঁছাতে হিমশিম খাচ্ছে।
তাঁর ভাষ্য, গরমের সময় সবচেয়ে বেশি চাহিদা থাকে পাম অয়েলের। ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া থেকেই সবচেয়ে বেশি পাম অয়েল আমদানি করে বাংলাদেশ। কিন্তু সম্প্রতি ইন্দোনেশিয়া তাদের পাম অয়েল রপ্তানিতে শুল্ক বসিয়েছে। তারা ভোজ্যতেলের চেয়ে ডিজেল উৎপাদনে বেশি মনোযোগী। তাছাড়া মাসখানেক আগে থেকেই বিশ্ববাজারে ভোজ্যতেলের দাম প্রায় ১০০ ডলার বেড়েছে। সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক বাজারে আরও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এসব কারণে বাজারে সরবরাহ কিছুটা কম।

তবে মেঘনা গ্রুপের সহকারী সিনিয়র মহাব্যবস্থাপক তাসলিম শাহরিয়ার দাবি করেছেন, তাদের কারখানায় পর্যাপ্ত তেল মজুত রয়েছে এবং বাজারে নিয়মিত সরবরাহ করা হচ্ছে। তাঁর মতে, কিছু মানুষ গুজবে কান দিয়ে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল কেনায় সাময়িক চাপ তৈরি হয়েছে।

বোতল সংকটে বেড়েছে খোলা তেলের দাম
বোতলজাত সংকটে খোলা তেলের বাজারে কিছুটা চাপ বেড়েছে। তাতে দরও বাড়িয়েছেন ব্যবসায়ীরা। গতকাল বাজারে প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেল ১৮০ থেকে ১৮৫ টাকায় বিক্রি হয়, যা গত সপ্তাহে ছিল ১৭৬ থেকে ১৭৮ টাকা। অর্থাৎ, লিটারে বেড়েছে চার থেকে সাত টাকা। সরকার নির্ধারিত প্রতি লিটার পাম অয়েলের দাম ১৬৬ টাকা হলেও খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১৭০ টাকা বা এর চেয়ে বেশি দরে।খোলা তেলের ব্যাপারে বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি গোলাম মাওলা বলেন, বোতলজাত তেলের কয়েক দিন ধরে সংকট চলছে। খোলা তেলের বাজারেও কিছুটা টান রয়েছে। এ কারণে বাজার বাড়তি।

কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ব্যবসায়ীরা সব সময় অজুহাত খোঁজেন। ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেল পরিবহনে সংকট হলেও এ কারণে ভোগ্যপণ্যের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে কিছুটা হলেও সময় লাগবে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা তার আগেই দাম বাড়ানোর কৌশল নিচ্ছেন। তাদের অতি মুনাফার অশুভ প্রতিযোগিতা বন্ধ না হলে ন্যায্য ব্যবসার পরিবেশ তৈরি হবে না। সমাজের অস্থিরতা বন্ধ হবে না। ঈদ সামনে রেখে তদারকি জোরদার করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিচালক আব্দুল জলিল সমকালকে বলেন, প্রতিদিনই বাজারে তদারকি করা হচ্ছে। দাম বৃদ্ধির ব্যাপারে জানা নেই। রোববার অধিদপ্তরের কয়েকটি টিম পাঠিয়ে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *