সুস্থ ধারার রাজনীতি: শুরু হোক পরিবর্তন

প্রকাশিত: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

একটি রাজনৈতিক দলের প্রাণশক্তি হলো তার তৃণমূল পর্যায়ের কর্মী ও সমর্থকরা। গাছের শিকড় যেমন মাটির গভীরে থেকে গাছকে প্রতিকূলতার মাঝেও টিকিয়ে রাখে, রাজনীতিতে তৃণমূলের অবস্থানও ঠিক তেমন। কিন্তু বর্তমান সময়ে আমরা এক গভীর সংকটের মুখোমুখি হচ্ছি—আর তা হলো তৃণমূলের রাজনীতিতে সুস্থ চর্চার অভাব। প্রশ্ন উঠছে, যদি মাঠপর্যায়ে রাজনীতির মূল আদর্শ ও জনসেবার মানসিকতা হারিয়ে যায়, তবে সেই দলের ভবিষ্যৎ কী? এবং এমন পরিস্থিতিতে নেতৃত্বের ভূমিকা আসলে কী হওয়া উচিত? তৃণমূল পর্যায়ে যখন রাজনীতির নামে পেশিশক্তি, চাঁদাবাজি বা গোষ্ঠীগত স্বার্থ বড় হয়ে ওঠে, তখন দলের নৈতিক ভিত্তি ধসে পড়ে। আদর্শিক চর্চা না থাকলে কর্মীরা আর নীতি-আদর্শের কথা বলে না, তারা তখন অন্ধ আনুগত্য আর ব্যক্তিগত লাভের পেছনে ছোটে। এর ফলে সবচেয়ে বড় যে ক্ষতিটি হয়, তা হলো জনবিচ্ছিন্নতা। সাধারণ মানুষ যখন দেখে একজন কর্মী জনসেবার বদলে ক্ষমতার দাপট দেখাচ্ছে, তখন তারা ধীরে ধীরে দল থেকে দূরে সরে যায়। আর জনগণের সমর্থনহীন রাজনৈতিক দল কেবল কাগজের বাঘ হয়ে টিকে থাকতে পারে, দীর্ঘমেয়াদে তা টিকে থাকা অসম্ভব।

সুস্থ রাজনীতির চর্চা না থাকলে দলের ভেতর ক্যানসারের মতো ছড়িয়ে পড়ে অভ্যন্তরীণ কোন্দল। পদের লোভ আর আধিপত্য বিস্তারের নেশায় কর্মীরা একে অপরের শত্রুতে পরিণত হয়। এই সুযোগটিই নেয় ‘সুযোগসন্ধানী’ বা ‘হাইব্রিড’ নেতারা। যারা কোনোদিন দলের আদর্শকে ধারণ করেনি, তারা কেবল ক্ষমতার ভাগ নিতে দলে ঢুকে পড়ে এবং ত্যাগী কর্মীদের কোণঠাসা করে দেয়। এতে করে দলের শৃঙ্খলা বা ‘চেইন অফ কমান্ড’ পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। এই সংকটে সবচেয়ে বড় দায়ভার বর্তায় শীর্ষ ও মধ্যম সারির নেতৃত্বের ওপর। নেতারা যদি কেবল ভোট ব্যাংক হিসেবে কর্মীদের ব্যবহার করেন, তবে এই পচন রোখা সম্ভব নয়। সুস্থ ধারা ফিরিয়ে আনতে নেতাদের কিছু সাহসী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:

শুদ্ধি অভিযান ও জবাবদিহিতা: দলের ভেতরে যারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে বা জনগণের ওপর জুলুম করছে, তাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। “অপরাধীর কোনো দল নেই”—এই কথাটি কেবল মুখে না বলে কাজে প্রমাণ করতে হবে।

আদর্শিক পুনর্জাগরণ: কর্মীদের জন্য নিয়মিত রাজনৈতিক পাঠশালা বা প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করা প্রয়োজন। দলের ইতিহাস, ত্যাগ এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা সম্পর্কে তাদের সচেতন করতে হবে। ত্যাগীদের মূল্যায়ন: পকেট কমিটি গঠনের সংস্কৃতি বন্ধ করে যারা দুর্দিনে দলের পাশে ছিল এবং যাদের ক্লিন ইমেজ রয়েছে, তাদের নেতৃত্বে নিয়ে আসতে হবে। জনমুখী কর্মসূচি: কর্মীদের এমন সব কাজে ব্যস্ত রাখতে হবে যা সরাসরি সাধারণ মানুষের কল্যাণে আসে। রাজনীতি যখন ড্রয়িং রুম বা ক্যাডারভিত্তিক হয়ে যায়, তখন তা বিষাক্ত হয়। একে মানুষের দুয়ারে নিয়ে যেতে হবে।

রাজনীতি কোনো ব্যবসা নয়, এটি একটি ব্রত। তৃণমূল পর্যায়ে যদি সহনশীলতা, পরমতসহিষ্ণুতা এবং ত্যাগের মহিমা না থাকে, তবে সেই রাজনীতি সমাজের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়। নেতাদের মনে রাখতে হবে, তৃণমূলের ভিত্তি যদি বালুর ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তবে বড় কোনো দুর্যোগে পুরো প্রাসাদ ধসে পড়তে সময় লাগবে না। সময় এসেছে আত্মোপলব্ধির; দলকে বাঁচাতে হলে আগে দলের মাঠপর্যায়ের কর্মীদের রাজনৈতিক চরিত্রে পরিবর্তন আনা জরুরি।

শেখ ফরিদ (কবি ও গণমাধ্যমকর্মী)

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *