তেল নয়, পারস্য উপসাগরের পানি ঘিরে বড় সংকট
প্রকাশ: ০৮ মার্চ ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর থেকেই হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। এই অবস্থায় বিশ্বে সৃষ্টি হয়েছে জ্বালানি সংকট এবং তেলের দাম বেড়েছে। তবে তেল নিয়ে সংকটের ব্যাপারটি যতটা আলোচনায় আছে, আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংকট নিয়ে আলোচনা হচ্ছে না, তা হলো পানি সংকট। এই যুদ্ধের ফলে ইরান যেমন পানি সংকটে পড়তে পারে, তেমনি গোটা মধ্যপ্রাচ্যও চরম পানি সংকটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কারণ যুদ্ধে ইরানের পানির উৎস ইতোমধ্যে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের পানি শোধনাগার লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। এই অবস্থায় তেলের পাশাপাশি এই যুদ্ধ পানির যুদ্ধে রূপ নিতে যাচ্ছে। ব্লুমবার্গের এক বিশ্লেষণে এসব কথা বলা হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান যুদ্ধ একটি ভিন্ন কৌশলগত বাস্তবতার আবরণ উন্মুক্ত করে দিয়েছে। তা হলো সবচেয়ে বড় সংকটের জায়গা তেল নয় বরং পানিই হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা যুক্তি দিচ্ছেন, জ্বালানি সরবরাহ বিশ্ববাজারকে প্রভাবিত করলেও ইরানের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের ক্ষমতা ক্রমবর্ধমানভাবে দেশটির তীব্র পানি সংকটের সঙ্গে যুক্ত। ইরান বিশ্বের সবচেয়ে পানি সংকটে থাকা একটি দেশ। দেশটির প্রায় সব নবায়নযোগ্য পানিসম্পদ ইতোমধ্যে কৃষি, শিল্প ও গার্হস্থ্য কাজের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে।
ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব ওয়ার্ল্ড অ্যাফেয়ার্সের মতে, কয়েক দশক ধরে খরা, কম বৃষ্টিপাত এবং ভূগর্ভের পানির অতিরিক্ত উত্তোলন ইরানের জলাধারগুলোকে বিপজ্জনকভাবে নিম্নস্তরে ঠেলে দিয়েছে। বছরের পর বছর ধরে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়া এবং অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে ইরানে বেশ কয়েকটি প্রধান জলাধার প্রায় খালি হয়ে গেছে ২০২৫ সালেই।
এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ভুগবে ইরানের কৃষি। ইরানের ৯০ শতাংশেরও বেশি পানি ব্যবহার হয় কৃষি খাতে। প্রায়ই অদক্ষ সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রচুর পরিমাণে পানি তারা অপচয় করে। যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট ধাক্কা পানির উৎসে আরও বড় প্রভাব পড়বে। কারণ পানি দেশটির সরাসরি খাদ্য উৎপাদন ও দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করতে পারে।
জিওপলিটিক্যাল মনিটরের মতে, নদী সংকুচিত হয়ে ইরানের জলাধারের অবনতি হয়েছে। হ্রদ শুকিয়ে ইতোমধ্যেই কৃষি উৎপাদন হ্রাস করেছে। কিছু গ্রামীণ সম্প্রদায়কে শহরে স্থানান্তরিত হতে বাধ্য করেছে। এ ক্ষেত্রে পানির চরম সংকট দেখা দিয়ে পরিবেশগত চাপ সৃষ্টি হবে। এতে দেশের অভ্যন্তরে বিক্ষোভ ও অস্থিরতার সৃষ্টি হতে পারে। এর আগেই কৃষকরা পানির দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন।
মধ্যপ্রাচ্যে দেখা দিতে পারে ভয়াবহ পানি সংকট
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ পানিকে মধ্যপ্রাচ্যের ‘কৌশলগত পণ্য’ বলে অভিহিত করেছে। তাদের বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, যদি সামরিক শত্রুতা বাড়তে থাকে, তাহলে পানিই হবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধের প্রধান ভূ-রাজনৈতিক উপাদান।
পারস্য উপসাগর ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যের একটি অসাধারণ হাইড্রোকার্বন সম্পদ দিয়ে ভর্তি। তা হলো পানি। মরুভূমি দেশগুলোর কাছেও যা নেই, তা হলো পানি। ১৯৭০-এর দশক থেকে এই অঞ্চলটি প্রায় ৪৫০টি পানি শোধনাগারের পর নির্ভর করে। আর এর খরচ জোগানো হয় তেল বিক্রি করেই।
সমুদ্রের পানিকে খাবারযোগ্য করার জন্য শোধনাগার তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী প্রযুক্তি হিসেবে রয়ে গেছে। এর নেতিবাচক দিক হলো স্থাপনাগুলোর দুর্বলতা। উপসাগরীয় দেশগুলোতে প্রায় ১০ কোটি মানুষ বাস করে। সৌদি আরব, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ওমান এখন ইরানের আক্রমণের শিকার। কুয়েত, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতও সমুদ্রের পানি থেকে খাবার পানি জোগায়। এ জন্য তারা পানি শোধনাগারের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ইরানের হামলায় এসব শোধনাগার প্রতিনিয়তই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্লান্টে আগুন লাগার ঘটনাও ঘটেছে। এই ঝুঁকি বিশাল সংকট সৃষ্টির কারণ হতে পারে।
সৌদি আরবের পারস্য উপসাগরীয় উপকূলে অবস্থিত জুবাইল ডিস্যালিনেশন প্লান্টের কথা বলা যায়। এই প্লান্ট রিয়াদকে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইন সিস্টেমের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করে। যা দেশটির মোট চাহিদার ৯০ শতাংশেরও বেশি পানীয় জল সরবরাহ করে। উইকিলিকস প্রকাশিত ২০০৮ সালে সৌদি আরবের মার্কিন দূতাবাসের একটি স্মারকলিপিতে বলা হয়, জুবাইল ডিস্যালিনেশন প্লান্ট ছাড়া সৌদি সরকারের বর্তমান কাঠামো টিকে থাকতে পারত না। অন্য দেশগুলোও অতিরিক্ত জল সরবরাহ প্লান্টের মাধ্যমে নিচ্ছে। ইরান যুদ্ধে এসব অবকাঠামো এখন খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ পানির প্লান্টগুলোতে আক্রমণ করলে উপসাগরীয় দেশগুলো মারাত্মক সংকটজনক পরিস্থিতিতে পড়ে যাবে।
