ইফতার প্রথম রোজাতেই সরগরম চকবাজার

প্রকাশ: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৯:১৮

রমজানের প্রথম দিনেই পুরান ঢাকার চকবাজার ফিরে পেয়েছে তার চিরচেনা রূপ। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে চকবাজার শাহি মসজিদের সামনে সার্কুলার রোডের দুই পাশজুড়ে সাজতে শুরু করে ইফতারসামগ্রীর রঙিন পসরা। জোহরের নামাজের পর থেকে শুরু হয় বিক্রেতাদের হাঁকডাক। বিকেলের আগেই শত শত ক্রেতার ভিড়ে জমে ওঠে পুরো এলাকা। হাঁটার জন্য মাঝখানে তিন সারি ফাঁকা রাখা হলেও ক্রেতার চাপ বাড়তে থাকায় সড়কজুড়ে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ।

প্রতিবারের মতো এবারও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ গতকাল চকবাজার ছুটে গিয়েছিলেন পছন্দের ইফতারসামগ্রী কিনতে। পুরান ঢাকার বাসিন্দাদের পাশাপাশি নয়াপল্টন, শাহবাগ, ধানমন্ডি, ইস্কাটন, শান্তিনগর কিংবা সূত্রাপুর থেকেও গিয়েছিলেন অনেকে। নয়াপল্টন থেকে আসা ব্যবসায়ী হেলাল উদ্দিন জানালেন, প্রতিবছরই তিনি এখানে আসেন। ইফতারসামগ্রীর দাম কিছুটা বেশি হলেও স্বাদের কারণে এই বাজার মিস করেন না। শাহবাগ এলাকা থেকে আসা মাহমুদুর রহমান অভিযোগ করেন, চকবাজারের ইফতারের স্বাদ আগের চেয়ে কিছুটা কমেছে। তিনি জানালেন, তাঁর পরিবারের ঐতিহ্য, রোজার প্রথম দিনের ইফতারি চকবাজার থেকে আনা। তাই পছন্দের ইফতারসামগ্রী কিনতে এসেছেন।

ধানমন্ডি থেকে প্রথমবারের মতো চকবাজারে ইফতারি কিনতে গিয়েছিলেন জুয়েল মাহমুদ। তিনি বলেন, চকবাজার মসজিদের সামনের পুরো গলিটা ঘুরে দেখলাম। একই জিনিস একেক দোকানে একেক দামে বিক্রি করছে। আমার কাছে দাম বেশি মনে হয়েছে। এক পিস ছোট মুরগির রোস্ট ৪৫০ টাকা দাম চাইল; এটা অনেক বেশি। আমি যেহেতু আজ প্রথমবারের মতো কিনতে এসেছি, ফলে মানের বিষয়টি এখনই বলতে পারছি না। তবে দেখে লোভনীয় মনে হলেও খেতে কেমন হবে, সেটা পরে বলতে পারব।

ঐতিহ্যের কারণে অনেক মানুষ চকবাজারে ভিড় করলেও খোলা জায়গায় খাবার বিক্রি হওয়ায় তা নিয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকির কথাও বলেছেন অনেকে। বিকেলে সরেজমিন দেখা গেছে, অধিকাংশ দোকানেই খাবার খোলা অবস্থায় রাখা হয়েছে। ঢাকার ব্যস্ত সড়কের ধুলা বাতাসে উড়ে এসে খাবারের ওপর পড়ছে। অনেক বিক্রেতা এর মধ্যেই তেল মেখে খাবার চকচকে রাখছেন। বেশির ভাগ আইটেমই ঠান্ডা হয়ে আছে, তবু ক্রেতাদের আগ্রহে ভাটা নেই। এদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে ইফতারসামগ্রীর দামেও। বিশেষ করে মাংসনির্ভর পদগুলোর দাম গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এ বছর চকবাজারে সুতি কাবাব প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ২০০ টাকায়, যা গত বছর ছিল এক হাজার টাকা। খাসির লেগ রোস্ট এবার এক হাজার ২০০ টাকা, গত বছর ছিল ৮০০ টাকা। তন্দুরি চিকেন প্রতি পিস ৪০০ টাকা, যা গত বছর ৩০০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। গরুর সুতি কাবাব ১২০০ টাকা কেজি এবং খাসির সুতি কাবাব ১৫০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া শাহি ছোলা ৩২০ টাকা, ঘুগনি ১৬০ টাকা, চিকেন আচারি ১৩০ টাকা, কাশ্মীরি বিফ আচারি ১৫০ টাকা। হালিমের বাটি ১০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত। প্রায় ৫০ পদের ইফতারির মধ্যে অন্থন ৩০ টাকা, চিকেন সাসলিক ৪০ টাকা, বঁটি কাবাব ১৩০ টাকা, শাহি জিলাপি প্রতি কেজি ৩০০ টাকা, কোয়েল পাখির রোস্ট ৮০ টাকা, কবুতর রোস্ট ৮০ টাকা, আস্ত মুরগির রোস্ট ৪৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

চকবাজারের জনপ্রিয় আইটেম ‘বড় বাপের পোলায় খায়’। এবার এই বিশেষ খাবারটি প্রতি কেজি ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ৩৬টি উপকরণে তৈরি এই পদে থাকে খাসি ও মুরগির মাংস, বঁটি কাবাব, ডিম, আলু, ছোলা, ঘি ও বিশেষ মসলা। অনেক ক্রেতাই ঠোঙা ভরে এটি কিনছেন পরিবারের জন্য।
বিক্রেতারা বলছেন, তেল, মসলা ও মাংসের দাম বাড়ায় ইফতারসামগ্রীর দাম কিছুটা বাড়তি। তবে খুব বেশি বাড়ানো হয়নি; বাজারে প্রতিযোগিতা থাকায় দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। কেউ দাম বেশি রাখলে ক্রেতা পাশের দোকানে চলে যান। প্রথম দিনের বিক্রি নিয়ে তারা সন্তুষ্ট, সামনে বিক্রি বাড়বে বলে আশা করছেন।

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *