নতুন সরকার ইশতেহার ধরে ১৮০ দিনের পরিকল্পনা তৈরির কাজ শুরু

অবকাঠামোগত প্রকল্পের চেয়ে রাষ্ট্র সংস্কার ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে জোর

 প্রকাশ: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৯:১৫

সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা তৈরির কাজ শুরু করেছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারকে প্রাধান্য দিয়ে শাসনব্যবস্থা পুনর্গঠন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ, দুর্নীতিবিরোধী কাঠামো শক্তিশালীকরণ, বাকস্বাধীনতা, অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের মতো বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর পাশাপাশি সরকারের স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েও কাজ শুরু হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। মন্ত্রীরা খুব শিগগির তাদের কর্মপরিকল্পনা প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করবেন। এরপর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, সারাদেশে খাল খনন কর্মসূচি শুরু করার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে নতুন সরকার। ১৮০ দিনের কর্মসূচির আওতায় বেশির ভাগ খাল খনন শুরু হবে। পাশাপাশি ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করার লক্ষ্যে কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে দেশের আটটি বিভাগের প্রতিটিতে একটি উপজেলায় এই কার্ড চালুর ব্যবস্থা করা হবে। এ ছাড়া প্রতিবছর পাঁচ কোটি বৃক্ষরোপণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গত মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এদিন তাঁর নেতৃত্বে ২৫ জন মন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী নিয়ে নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়। তাদের মধ্যে ৪১ জনই নতুন মুখ। অনেকে এবারই প্রথম সংসদ সদস্য হয়েছেন। প্রথমবার নির্বাচিত হয়েই মন্ত্রিসভায় জায়গা করে নিয়েছেন ৩৩ জন।

নতুন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের মধ্যে কয়েকজন সমকালকে জানান, তারা দিনরাত কাজ করছেন। প্রধানমন্ত্রী তাদের যেভাবে নির্দেশনা দিচ্ছেন তাতে খুব শিগগির সবকিছু আয়ত্তে আনা সম্ভব হবে। বেশ কয়েকজন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনামতো নির্বাচনের ইশতেহারকে প্রাধান্য দিয়ে তারা কাজ করে যাচ্ছেন। এর বাইরেও বিভিন্ন সেক্টর অনুযায়ী তারা কাজ ভাগ করছেন। তারা বলেন, দুর্নীতি-দুঃশাসনে বিপর্যস্ত অর্থনীতিতে বিরাট ক্ষত রয়ে গেছে। চারদিকে মব কালচার, দাবি-দাওয়া নিয়ে আন্দোলনে রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়ার উপক্রম। এর মধ্যেই নতুন সরকার লক্ষ্য পূরণে প্রাধান্য দিয়ে কাজ করছে।

নেতারা জানান, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা, দুর্নীতির সিন্ডিকেট ভেঙে ফেলার লক্ষ্য রয়েছে তাদের। পাশাপাশি এই মুহূর্তে বড় কোনো অবকাঠামোগত প্রকল্পের চেয়ে রাষ্ট্রীয় সংস্কার এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের ওপর সর্বোচ্চ জোর দিচ্ছে সরকার। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, রেলপথ মন্ত্রণালয় ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী রাজীব আহসান সমকালকে বলেন, ‘আমরা নতুন সরকার হিসেবে মাত্র দায়িত্ব নিয়েছি। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে বিভিন্ন বিষয়ে খোঁজ নিচ্ছি। আমাদের কার্যক্রম দ্রুত এগোবে বলে বিশ্বাস করি।’

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা তাদের পরিকল্পনায় আত্মকর্মসংস্থান ও বহির্বিশ্বে চাকরির সুযোগ তৈরিতে শিক্ষার্থীদের দক্ষ এবং যোগ্য করে গড়ে তুলতে মাধ্যমিক পর্যায়ে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার বিষয়কে গুরুত্ব দিচ্ছেন। শিক্ষক-শিক্ষিকা, ছাত্র-ছাত্রী সবার জন্য পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিতকরণ, স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট নির্মাণ এবং সারাদেশে পর্যায়ক্রমে প্রান্তিক ও দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য ‘মিড-ডে মিল’ চালুর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। শিক্ষামূলক ছবি, ভিডিও, ডকুমেন্টারি ও অনলাইন কনটেন্টের মাধ্যমে কারিকুলাম ও নৈতিক শিক্ষার জন্য প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন; দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থান ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরিতে বাংলা-ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় ভাষা শিক্ষা মাধ্যমিক পর্যায় থেকে চালু করার বিষয়কে তাদের ছয় মাসের কর্মপরিকল্পনায় অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় দেশব্যাপী টেকনিক্যাল ও ভোকেশনাল শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে আধুনিকায়ন করে দক্ষতানির্ভর কর্মসংস্থান, হাতে-কলমে প্রযুক্তি শিক্ষা, শিল্প-কারখানায় সরাসরি প্রশিক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক মানের সনদের ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। এতে তরুণরা দেশীয় শিল্প, বাস্তবতানির্ভর প্রশিক্ষণ এবং বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরির জন্য প্রস্তুত হয়ে সরাসরি কর্মসংস্থানে যুক্ত হতে পারবে। একইভাবে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনায় ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ কর্মসূচি শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে ১২-১৪ বছরের প্রতিভাবান ক্রীড়া শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান করে দেশে ক্রীড়াকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। আবার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় আগামী শিক্ষাবর্ষে চতুর্থ শ্রেণি থেকে খেলাধুলা বাধ্যতামূলক করা হবে। যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক এরই মধ্যে এসব বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন এবং বাস্তবায়নে উদ্যোগ নিয়েছেন।

‘ন্যায্য, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ’ গড়ার অঙ্গীকার বাস্তবায়নই নতুন প্রধানমন্ত্রীর প্রাথমিক লক্ষ্য। প্রায় চার বছর আগে রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের ৩১ দফা রূপরেখা ঘোষণা করেছিলেন তারেক রহমান। সেটিই পরবর্তী সময়ে নির্বাচনী ইশতেহারে বিস্তৃত আকারে সন্নিবেশ করা হয়। যার মূলমন্ত্র হলো ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। এতে গণভিত্তিক কল্যাণ কর্মসূচি এবং জনস্বার্থমুখী অর্থনীতি গড়া প্রাধান্য পাবে। পাশাপাশি তরুণদের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন এবং শিক্ষা পরিব্যাপ্তির প্রতিও নিবিড় মনোযোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। মূলত শিক্ষা ও দক্ষতা এবং কর্মসংস্থানের প্রাধান্য বিএনপির ইশতেহারের কেন্দ্রবিন্দু। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সব পরিবারে ‘ফ্যামিলি কার্ড’, স্বাস্থ্য কার্ড, কৃষি কার্ড প্রদানের পাশাপাশি তরুণদের জন্য চাকরি-কর্মসংস্থান সৃষ্টির ব্যাপক কর্মসূচি নেওয়া হবে। সংশ্লিষ্টরা জানান, বিএনপির স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে সুশাসন ও বিচার বিভাগীয় সংস্কার; সংবিধান সংস্কার কমিশন; বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখা; দুর্নীতি বন্ধ ও মানবাধিকার রক্ষা; দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা; সিন্ডিকেট ভাঙতে কঠোর আইনি ব্যবস্থা এবং নিত্যপণ্যের সরবরাহ চেইন সচল করা; নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য প্রতিটি পরিবারে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বিতরণ এবং এর মাধ্যমে ভর্তুকি মূল্যে খাদ্য সহায়তা প্রদান; খেলাপি ঋণ আদায়ে টাস্কফোর্স গঠন প্রক্রিয়া শুরু করা।

গতকাল সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, প্রথম দিনে মন্ত্রিসভার বৈঠকে সদস্যরা সবাই উপস্থিত ছিলেন; উপদেষ্টারাও ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী সদস্যদের উদ্দেশে বক্তব্য দিয়েছেন; অনুশাসনও দিয়েছেন। সাধারণত প্রথম ১০০ দিনের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়। তবে আমরা ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেছি। সেটা আরও পরে প্রকাশ করা হবে।

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *