বেতন মিলছে না ১৭ মাস, বন্ধের পথে স্বাস্থ্য বাতায়ন
প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
দৈনিক গড়ে সাড়ে ছয় হাজার মানুষ ফোন করেন ১৬২৬৩ নম্বরে। চিকিৎসকের পরামর্শ, মানসিক কিংবা স্বাস্থ্যসেবা সব কিছুর জন্য অনেকের ভরসা এই একটি নম্বর। সেই জাতীয় টেলি-স্বাস্থ্য প্ল্যাটফর্ম স্বাস্থ্য বাতায়ন এখন বন্ধের শঙ্কায়।
গত ১৭ মাস ধরে দায়িত্ব পালন করলেও বেতন পাননি সেবায় নিয়োজিত চিকিৎসক ও কর্মীরা। তবু সেবা চালু আছে। সামনে এপ্রিলে প্রকল্পের চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু নবায়ন নিয়ে এখনও দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই। ফলে সাধারণ মানুষের জন্য বিনামূল্যের এই স্বাস্থ্যসেবার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমের (এমআইএস) ই-হেলথ কার্যপরিকল্পনার আওতায় ২০১৫ সালে চালু হয় বিনামূল্যের এই সেবা। শুরুতে সীমিত পরিসরে থাকলেও সময়ের সঙ্গে এটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। স্বাস্থ্য বাতায়নের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এখন পর্যন্ত ২৩ লাখ ৪৬ হাজার ৭৭৩ জন এই নম্বরে ফোন করে চিকিৎসা-পরামর্শ নিয়েছেন। গড়ে প্রতিদিন কল এসেছে ছয় হাজার ৪২৯টি। চালুর পর থেকে এখন পর্যন্ত মোট কলের সংখ্যা দুই কোটি ৭০ লাখ ছাড়িয়েছে। নানা রোগের পরামর্শ সেবা মেলে এখানে।
বর্তমানে এই প্ল্যাটফর্মে ১০০ জন চিকিৎসক ও ২৫ জন হেলথ ইনফরমেশন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করছেন। তবে তাদের বেতন বকেয়া রয়েছে ১৭ মাসের। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বারবার তাগাদা দেওয়া হলেও অর্থ ছাড়ের বিষয়ে কোনো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না।
সরকারি উদ্যোগে পরিচালিত হলেও প্রকল্পটি একটি বেসরকারি আইটি প্রতিষ্ঠান সিনেসিস হেলথের মাধ্যমে আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছে। তিন বছর পরপর চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হয়। চলমান মেয়াদ আগামী এপ্রিলে শেষ হওয়ার কথা। তবে নবায়ন বা নতুনভাবে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে এখনও কোনো আলোচনা হয়নি বলে জানা গেছে।
সিনেসিস হেলথের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ডা. নিজামউদ্দিন আহমেদ বলেন, বিনামূল্যের এই জাতীয় সেবাটি আউটসোর্সিং জনবল দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। ১৭ মাস ধরে বেতন না পেলেও চিকিৎসকরা দায়িত্ব পালন করছেন। বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে জানানো হয়েছে, কিন্তু সমাধান হয়নি। সামনে চুক্তির মেয়াদ শেষ হলেও নবায়ন নিয়ে কোনো অগ্রগতি নেই। স্বাস্থ্য বাতায়ন থেকে সংগৃহীত তথ্য নিয়মিতভাবে সরকারের কাছে পাঠানো হয়। মাসিক, ত্রৈমাসিক ও বার্ষিক প্রতিবেদন স্বাস্থ্য পরিকল্পনা প্রণয়নে সহায়ক হিসেবে ব্যবহৃত হয় বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সেবা বন্ধ হয়ে গেলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বড় ধরনের সংকটে পড়বে। বিশেষ করে শহর ও গ্রামাঞ্চলের এমন অনেক এলাকা রয়েছে, যেখানে সরাসরি চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য নয়। সেখানে ১৬২৬৩ নম্বরটি কার্যত একটি ভার্চুয়াল স্বাস্থ্যকেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে।
ডা. নিজামউদ্দিন আহমেদ বলেন, স্বাস্থ্য বাতায়নের নম্বরটি প্রচারের জন্য আমাদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার যেসব প্রতিষ্ঠান আছে, তার সবগুলোকে কাজে লাগানো প্রয়োজন। আমাদের কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন সাব সেন্টার, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র, উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্স, জেলা সদর হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল– এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এ নম্বরটি ব্যাপকভাবে প্রচারের উদ্যোগ নিতে হবে। ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত সদস্য থেকে শুরু করে সব নির্বাচিত প্রতিনিধি এ নম্বরটি তার এলাকার মানুষকে জানাবেন। তাহলে এই সেবার পরিধি আরও বাড়বে। এসব কাজে সবার অংশ নেওয়া জরুরি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিদ বলেন, তারা সম্প্রতি দায়িত্ব নিয়েছেন। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, ‘আমরা এমন কোনো উদ্যোগ নেব না, যাতে জনগণের ক্ষতি হয়। তবে একটু সময় লাগবে গুছিয়ে উঠতে।’
