সরাসরি দুই হাজার কোটি টাকার ডিজেল-অকটেন কিনবে সরকার

প্রকাশ: ১৬ মার্চ ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় জরুরি ভিত্তিতে অতিরিক্ত জ্বালানি তেল আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সরাসরি প্রায় দুই হাজার ৪৬ কোটি টাকার ডিজেল ও অকটেন কেনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সৌদি রাজপরিবারের মালিকানাধীন দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান পেট্রোগ্যাস থেকে এ তেল আমদানি করা হবে।

গত বৃহস্পতিবার জ্বালানি বিভাগ এ-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনের জন্য পাঠিয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) আমদানি করা জ্বালানি তেলের ৫০ শতাংশ সরকার-টু-সরকার পদ্ধতিতে এবং বাকি ৫০ শতাংশ আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে সংগ্রহ করে।  সরকার-টু-সরকার চুক্তির আওতায় সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় কোম্পানি সৌদি আরামকো থেকে আরাবিয়ান লাইট ক্রুড এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি (অ্যাডনক) থেকে মারবান ক্রুড অয়েল আমদানি করে। এসব অপরিশোধিত তেল দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারিতে প্রক্রিয়াজাত করা হয়। দেশে ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের বড় অংশই আমদানির ওপর নির্ভরশীল।

মন্ত্রিসভা কমিটিতে পাঠানো সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পরিপ্রেক্ষিতে ইরান ১ মার্চ থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি তেলবাহী জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে এবং দামে অস্থিরতা বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে ঝুঁকিতে পড়েছে বিপিসির অপরিশোধিত তেল আমদানি। পাশাপাশি মার্চ ও এপ্রিল মাসের পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। মার্চ মাসে জ্বালানি তেল আমদানির জন্য ১৭টি এলসি খোলা হলেও এখন পর্যন্ত চারটি জাহাজে তেল এসেছে এবং ছয়টি জাহাজ আসার অপেক্ষায় রয়েছে। সাতটি পার্সেলের বিষয়ে এখনও কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, এপ্রিলের জন্য ১৫টি এলসি খোলা হলেও এর মধ্যে ১৩টি পার্সেলের প্রাথমিক সম্মতি মিলেছে; কিন্তু এখন পর্যন্ত মাত্র তিনটির সরবরাহ নিশ্চিত হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিদ্যমান চুক্তির বাইরে জরুরি ভিত্তিতে অতিরিক্ত জ্বালানি তেল আমদানির উদ্যোগ নেয় বিপিসি। এ জন্য বিভিন্ন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় গত ৬ মার্চ পেট্রোগ্যাস ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। দুবাইভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠানটি সৌদি রাজপরিবারের মালিকানাধীন জ্বালানি সরবরাহকারী হিসেবে পরিচিত এবং উপসাগরীয় অঞ্চল ও ইউরোপে জ্বালানি তেল সরবরাহ করে আসছে।

পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় জরুরি প্রয়োজনে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে পণ্য সংগ্রহের সুযোগ রয়েছে। সেই বিধান অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির কাছে মূল্যসংবলিত প্রস্তাব আহ্বান করা হলে তারা গত ৯ মার্চ আনুষ্ঠানিক দর প্রস্তাব জমা দেয়।

প্রস্তাব অনুযায়ী, জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে পণ্য লোডিংয়ের তারিখে প্রকাশিত প্ল্যাটস (আরব উপসাগর) সূচক মূল্যের সঙ্গে প্রতি ব্যারেলে ৩ ডলার প্রিমিয়াম যোগ করে। প্রস্তাব পাওয়ার পর বিপিসি একটি মূল্যায়ন কমিটি গঠন করে এবং তারা পণ্যের মান পরীক্ষা করে দেখতে পায়, তা দেশের নির্ধারিত মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বর্তমানে বিপিসি ৫০ পিপিএম সালফার সীমার মধ্যে ডিজেল আমদানি করে থাকে।

হিসাব অনুযায়ী, ১ লাখ টন ডিজেল আমদানিতে সম্ভাব্য ব্যয় হবে প্রায় ১৩ কোটি ৫৮ লাখ ডলার বা প্রায় ১ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা। আর ২৫ হাজার টন অকটেন আমদানিতে ব্যয় হবে প্রায় ৩ কোটি ৯ লাখ ৯০ হাজার ডলার বা প্রায় ৩৮০ কোটি ২৪ লাখ টাকা।

সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক দরপত্রে অতীতে ডিজেলের জন্য প্রাপ্ত প্রিমিয়াম ছিল প্রতি ব্যারেলে ৪ ডলার ৭২ সেন্ট থেকে ৪ ডলার ৭৮ সেন্ট এবং সরকার-টু-সরকার আলোচনায় সর্বনিম্ন প্রিমিয়াম পাওয়া গিয়েছিল ৫ ডলার ৩৩ সেন্ট। অকটেনের ক্ষেত্রে সেই প্রিমিয়াম ছিল প্রায় ৬ ডলার ৮০ সেন্ট পর্যন্ত। সেই তুলনায় বর্তমান পরিস্থিতিতে ৩ ডলার প্রিমিয়ামে জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রস্তাবকে প্রতিযোগিতামূলক হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। বিপিসির ১১ মার্চের পরিচালনা পর্ষদের এ ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়।

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *