শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় বদরুদ্দীন উমরকে শেষ বিদায়
০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ |
আজ সকাল ১০টা থেকে দুপুর পৌনে ১টা পর্যন্ত তার মরদেহ রাখা হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। সেখানে ভিড় জমে দেশের রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী, সংস্কৃতিকর্মী, গবেষক ও সাধারণ মানুষের। শ্রদ্ধার অর্ঘ্যে ভরে ওঠে শহীদ মিনারের প্রাঙ্গণ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী শ্রদ্ধা জানাতে এসে বলেন, বদরুদ্দীন উমর অসাধারণ মানুষ ছিলেন। তিনি কখনো আপস করেননি। জ্ঞানে, গবেষণায় তিনি আমাদের পথপ্রদর্শক। হতাশার বদলে সবসময় আশার কথা বলেছেন। তার কাছে আমরা ঋণী।
কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার মনে করিয়ে দেন উমর ছিলেন বাংলাদেশের জাতিবাদী ধারার এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি। ‘তিনি স্রোতের সঙ্গে গা ভাসাননি। বিশ্বাসকে মানুষের পক্ষে দাঁড় করিয়েছেন। আগামী দিনের ইতিহাসের বিবর্তনে তার অবস্থান অনস্বীকার্য,’ বলেন তিনি।
অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ মন্তব্য করেন, রাজনীতির তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ কিংবা সাংগঠনিক চর্চা- সবখানেই বদরুদ্দীন উমরকে পড়তে হবে। মানুষের পক্ষে থেকে আজন্ম তিনি গবেষণা করেছেন। নিজের জীবনের প্রতি তার সন্তুষ্টি ছিল স্পষ্ট।
বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম বলেন, ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বুঝতে তার লেখা অপরিহার্য। মতাদর্শিক সততা ও বুদ্ধিজীবীসুলভ সাহসে তিনি ছিলেন ব্যতিক্রম।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শাহমান মৈশান জানান, উমর সাংস্কৃতিক আন্দোলন ও রাজনৈতিক ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ককে নির্মোহভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। ‘এই চিন্তাপদ্ধতি তরুণদের প্রজন্মের পর প্রজন্মকে প্রভাবিত করেছে এবং করবে,’ বলেন তিনি।
সরকারের শ্রদ্ধা
সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টাও শহীদ মিনারে উপস্থিত হয়ে শ্রদ্ধা জানান। মহিলা ও শিশু বিষয়ক উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশীদ বলেন, ‘একজন আপসহীন মানুষকে আমরা হারালাম। তিনি আদর্শে অবিচল ছিলেন। সংগ্রামের ইতিহাসে তিনি অমর।’
সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী স্মরণ করেন, ‘২৪ সালের অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছিলেন তিনি। রাষ্ট্রীয় পুরস্কার নিতে তিনি রাজি হননি। কারণ তিনি নিজেকে পুরস্কারের ঊর্ধ্বে ভাবতেন।’
এছাড়া শিক্ষা উপদেষ্টা সি আর আবরার, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার, আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমেদ তয়্যবও শ্রদ্ধা জানান।
রাজনৈতিক অঙ্গনের স্মরণ
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিবুন নবী খান পলাশ বলেন, ‘তিনি সবসময় ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। কোনো দিন বিবেককে বন্ধক রাখেননি।’
কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স জানান, উমর শেষ পর্যন্ত নিজের মতাদর্শে অবিচল ছিলেন। ‘তিনি আজীবন মানুষের পক্ষে থেকেছেন, আপস করেননি,’ বলেন তিনি।
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম স্মরণ করেন, বদরুদ্দীন উমর হাসিনার শাসনকে ফ্যাসিবাদ আখ্যা দিয়েছিলেন এবং জুলাইয়ের আন্দোলনকে অভ্যুত্থান হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন।
গণসংহতি আন্দোলনের সমন্বয়ক জুনায়েদ সাকী বলেন, ‘বদরুদ্দীন উমরকে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। সংগঠন হয়তো বড় হয়নি, কিন্তু তার আদর্শ মানুষের প্রতি নিষ্ঠাবান থেকে গেছে। ভবিষ্যতেও মুক্তির লড়াইয়ে তিনি প্রেরণা হবেন।’
সর্বস্তরের শ্রদ্ধা
বিএনপি, সিপিবি, ছাত্র ইউনিয়ন, বাংলাদেশ জাসদ, জাতিসত্তা মুক্তি সংগ্রাম, লেখক শিবির, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল, বাম ঐক্য, সমাজতান্ত্রিক দলসহ অসংখ্য সংগঠন শহীদ মিনারে ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন করে।
শ্রদ্ধার পর মরদেহ নেওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে। জানাজা শেষে জুরাইন কবরস্থানে এই আপসহীন মানুষকে চিরনিদ্রায় শায়িত করার কথা রয়েছে।
