নারী দিবস আনুষ্ঠানিকতার আয়নায় অধিকার ও অর্জন
প্রকাশ: ০৮ মার্চ ২০২৬
নারী অধিকার, সমতা ও ক্ষমতায়নের দাবিকে বিশ্বের নজরে আনতে ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘ আনুষ্ঠানিকভাবে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এর পর থেকে বিশ্বের প্রায় সব দেশে এটি কেবল উদযাপন নয়; বরং নারীর অবদান, সংগ্রাম ও সমতার বার্তা পুনর্ব্যক্ত করার দিন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। বাংলাদেশে নব্বই দশক থেকে দিবসটি রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হয়ে আসছে। আন্তর্জাতিক নারী দিবসে জাতিসংঘ নির্ধারিত বৈশ্বিক প্রতিপাদ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশ জাতীয় প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করে থাকে। গত এক দশকে এসব প্রতিপাদ্যের ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করলে দেখা যায়, সময়ের প্রয়োজন ও বৈশ্বিক আলোচনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নারীর অগ্রগতি, অধিকার ও সমতার বিষয়টি বিভিন্নভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
গত এক দশকে ঘোষিত প্রতিপাদ্যগুলোর মধ্যে ২০১৬ সালের ‘অধিকার মর্যাদায় নারী-পুরুষ সমানে সমান’ থেকে ২০২৫ সালের ‘সকল নারী ও মেয়েদের জন্য: অধিকার, সমতা, ক্ষমতায়ন’ রাষ্ট্রের নীতিগত প্রতিশ্রুতির ধারাবাহিকতা নির্দেশ করে। কিন্তু প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার মধ্যে এখনও বড় ব্যবধান রয়ে গেছে। গত এক দশকে বাংলাদেশের নারীরা উন্নয়নের নানা সূচকে এগোলেও তাদের জীবন এখনও সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতার নানা চ্যালেঞ্জে ঘেরা।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের ২০২৪ সালের সহিংসতাবিষয়ক জরিপ অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৭৬ শতাংশ নারী জীবনের কোনো না কোনো সময়ে স্বামী বা ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর সহিংসতার শিকার; ৪১ শতাংশ নারী এক বছর আগেও এ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন। একই জরিপে দেখা গেছে, সামগ্রিকভাবে ৭৫.৯ শতাংশ নারী জীবনে অন্তত একবার কোনো না কোনো ধরনের সহিংসতার সম্মুখীন হয়েছেন।গত পাঁচ বছরের তথ্যও উদ্বেগজনক। মানবাধিকার সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২৪ সালে ১১ হাজার ৭৫৮ নারী ও কন্যাশিশু বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার শিকার। এর মধ্যে ৬ হাজার ৩০৫টি ধর্ষণ এবং এক হাজার ৮৯টি দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা রয়েছে। এদের মধ্যে ৫৫ শতাংশের বেশি অপ্রাপ্তবয়স্ক।
অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অংশীদারিত্ব
দেশের শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ এখনও পুরুষের তুলনায় অনেক কম। ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, কর্মক্ষম নারীর প্রায় ৪৪ শতাংশ শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ করেন; যেখানে পুরুষদের হার প্রায় ৮০ শতাংশ। কভিডকালে ও পরবর্তী সময়ে শ্রমবাজার থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হওয়া ১৭ লাখ মানুষের বড় অংশই নারী।
নারীর অদৃশ্য শ্রমও বৈষম্যের গুরুতর দিক। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও জাতিসংঘ নারী সংস্থা পরিচালিত টাইম-ইউজ জরিপ অনুযায়ী, দেশে নারীরা প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৬.৮ ঘণ্টা অবৈতনিক গৃহস্থালি ও যত্নশীল কাজ করেন; পুরুষদের এই সময় মাত্র ১.২ ঘণ্টা।
রাজনৈতিক অংশগ্রহণেও নারীরা এখনও পিছিয়ে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারীর সরাসরি নির্বাচিত প্রতিনিধি মাত্র সাতজন, যা মোট ৩০০ সাধারণ আসনের ২.৩৫ শতাংশ মাত্র। নির্বাচনে নারীর অংশগ্রহণও ছিল ৩.৯৩ শতাংশ; ২৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। ভোটার হিসেবেও নারীর অংশগ্রহণ এবার কম ছিল; অনেকে নির্বাচন চলাকালে অনলাইনে হয়রানির শিকার হন। এটি সামগ্রিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় নারীর অন্তর্ভুক্তি ও নেতৃত্ব বিষয়ে বিরূপ ইঙ্গিত দেয়।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি প্রকাশিত ‘জেন্ডার সোশ্যাল নর্মস ইনডেক্স’ অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রায় ৬৯ শতাংশ মানুষ মনে করেন, নারীর চাইতে রাজনৈতিক নেতৃত্বে পুরুষ আরও যোগ্য। এই চিত্র কেবল নারীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণকেই সরাসরি সীমিত করে না; পুরুষ ও নারীর উভয় পক্ষেই পুরুষকেন্দ্রিক মানসিকতার ব্যাপক উপস্থিতি নির্দেশ করে।
রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক দলের ভূমিকা
গত এক দশকে নারী দিবসের প্রতিপাদ্য এবং দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতায় স্পষ্ট বৈপরীত্য রয়েছে। নারীরা একদিকে উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে প্রশংসিত হচ্ছেন, অন্যদিকে ঘর, কর্মক্ষেত্র, জনপরিসর, অনলাইনে সহিংসতা ও বৈষম্যের ঝুঁকি বহন করছেন। প্রশ্ন ওঠে, প্রতিপাদ্যগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকর?
অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, নারী অধিকারবিষয়ক মূল্যায়ন ও পরিসংখ্যানগুলো প্রকল্পকেন্দ্রিক। উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তায় পরিচালিত বিভিন্ন প্রকল্পের ফলাফলকে প্রায়ই জাতীয় অগ্রগতির প্রতিনিধিত্ব হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, প্রতিবেদনগুলো কি রাষ্ট্রের নিজস্ব রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও নীতিগত উদ্যোগের প্রতিফলন, নাকি উন্নয়ন সহযোগীদের প্রত্যাশা পূরণের অংশ?
এটি অবশ্যই একপক্ষীয় প্রশ্ন নয়। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা রয়েছে আইন প্রণয়ন, নীতি নির্ধারণ, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে নারীর উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার। নারী উন্নয়ন নীতি, পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ আইন, যৌন হয়রানি প্রতিরোধে নীতিমালা– এসব উদ্যোগ রাষ্ট্রের সক্ষমতার উদাহরণ। কিন্তু বাস্তব পরিবর্তন কেবল নীতি প্রণয়নে সীমাবদ্ধ থাকে না। তার জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন।
রাজনৈতিক দলগুলো নারী অধিকার প্রতিষ্ঠাকে এখনও মূলধারায় সম্পৃক্ত করেনি। নির্বাচনী ইশতেহারে নারী অধিকারের বিষয়গুলো প্রায়ই পার্শ্বিক ইস্যু; মূল রাজনৈতিক এজেন্ডার বাইরে। এর ফলে নারীর কণ্ঠস্বর রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান হয় না এবং তাদের নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণ পুরুষকেন্দ্রিক কাঠামোর বাইরে কার্যকরভাবে প্রসারিত হয় না। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ আজও বাংলাদেশ সিডও সনদে স্বাক্ষর সত্ত্বেও বেশ কিছু ধারায় সংরক্ষণ আরোপ করেছে। সিডও হলো আন্তর্জাতিক চুক্তি, যা নারী ও পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত এবং বৈষম্য নিরসনে রাষ্ট্রগুলোর আইনগত ও নীতি নির্ধারণে বাধ্যবাধকতা আরোপ করে।
করপোরেট খাতের দায়
দেশের জনসংখ্যার প্রায় ৫১ শতাংশ নারী; করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো নারীদের লক্ষ্য করে বিপুল পরিমাণ পণ্য ও সেবা বাজারজাত করে। প্রশ্ন হলো, এই প্রতিষ্ঠানগুলো কি নারীকে শুধু ভোক্তা হিসেবে দেখে, নাকি তাদের জীবনের মানোন্নয়নে প্রকৃত ভূমিকা রাখার দায়িত্বও অনুভব করে? করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার আওতায় কিছু উদ্যোগ অবশ্যই দেখা যায়–নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন, দক্ষতা প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্য সচেতনতা ইত্যাদি। কিন্তু এসব উদ্যোগ অনেক ক্ষেত্রেই সীমিত বা প্রচারকেন্দ্রিক। অথচ নিরাপদ ও সমান কর্মপরিবেশ, মাতৃত্বকালীন সুবিধা, নেতৃত্বে নারীর অংশগ্রহণ এবং পণ্য-পরিষেবার পরিকল্পনায় নারীর প্রয়োজন অন্তর্ভুক্তি প্রায়ই অবহেলিত থাকে।
নারী আন্দোলনের প্রভাব ও কৌশল
মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে পরবর্তী দশকগুলোতে নারী অধিকার, শ্রম অধিকার, শিক্ষা এবং আইনি সংস্কারের ক্ষেত্রে নারী আন্দোলন এবং নারী অধিকার সংগঠনগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, বর্তমান বাস্তবতার আলোকে নারী আন্দোলনের কি সুস্পষ্ট, সমন্বিত কৌশল রয়েছে? বিশেষত নীতি পর্যায়ে কার্যকর অ্যাডভোকেসি ও রাজনৈতিক প্রভাব সৃষ্টিতে? আজকের প্রেক্ষাপটে নারী আন্দোলনের নতুন চিন্তাভাবনা অপরিহার্য– কীভাবে কৌশলগত পদক্ষেপের মাধ্যমে নারীবিরোধী প্রতিঘাতের বিপরীতে শক্তিশালী কাউন্টার ন্যারেটিভ তৈরি এবং সমন্বিতভাবে রাষ্ট্র, করপোরেট খাত ও সমাজের সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে নীতি বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা যায়। আন্দোলন শুধু প্রতিবাদ নয়; সুসংগঠিত নীতি-অ্যাডভোকেসি প্ল্যাটফর্মে রূপান্তরিত হওয়া প্রয়োজন। সেখানে নারীর ক্ষমতায়ন কেবল নারীর ওপর নির্ভর করবে না; বরং পুরুষ নেতৃত্ব, সামাজিক কাঠামো এবং রাজনৈতিক শক্তিকেও অংশীদার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করবে।
সমতা, ন্যায় ও কর্মসূচি
২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রতিপাদ্য ‘সকল নারী ও মেয়েদের জন্য অধিকার, ন্যায় ও কর্মসূচি’। এ প্রতিপাদ্য বলছে, সমতা শুধু স্লোগান নয়; বরং তা বাস্তব পদক্ষেপের মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে। এই প্রতিপাদ্য অনুযায়ী, নারী দিবস কেবল উদযাপন নয়, বরং কার্যকর পদক্ষেপ, সামাজিক প্রতিশ্রুতি এবং নেতৃত্বের জন্য তৎপরতা প্রদর্শনের দিন হওয়া উচিত, যাতে নারীর অধিকার ও ক্ষমতায়ন প্রতিদিনের বাস্তবতায় রূপান্তরিত হয়। এটি সরকার, রাজনৈতিক দলগুলো, করপোরেট খাত, পরিবার ও সমাজে এবং নারী আন্দোলনের জন্য স্পষ্ট আহ্বান– নারী অধিকার নিশ্চিত করা একটি সমন্বিত, ধারাবাহিক ও কার্যকরী অঙ্গীকার।
ফারহানা হাফিজ: জেন্ডার বিশ্লেষক
