চুলা জ্বালাতেই বিস্ফোরণ চট্টগ্রামে একজনের মৃত্যু, দগ্ধ ৮ ঢাকায় দগ্ধ আরও ৪
প্রকাশ: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
চট্টগ্রাম নগরের একটি বাসায় বিস্ফোরণে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় দগ্ধ হয়েছেন নারী-শিশুসহ আরও আটজন। গতকাল সোমবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে নগরের হালিশহর আবাসিক এলাকার এইচ ব্লকের ১ নম্বর সড়কের ১৮ নম্বর বাড়ির তৃতীয় তলার একটি ফ্ল্যাটে এ ঘটনা ঘটে। ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তাদের ধারণা, রান্নাঘরে জমে থাকা গ্যাসে এই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে।
দগ্ধ ব্যক্তিদের প্রথমে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে চিকিৎসা দেওয়া হয়। দুপুরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাদের সবাইকে ঢাকায় পাঠানো হয়। জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আবাসিক চিকিৎসক শাওন বিন রহমান গতকাল রাতে বলেন, একজন এরই মধ্যে মারা গেছেন, বাকি আটজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। আমরা চিকিৎসার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।
এদিকে রাজধানীর হাজারীবাগের একটি বাসায় গতকাল ভোরে গ্যাসের চুলা জ্বালানোর সময় জমে থাকা গ্যাস বিস্ফোরণে এক শিশুসহ চারজন দগ্ধ হয়েছেন। তাদের জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের সবার অবস্থাও সংকটাপন্ন।
বিস্ফোরণে উড়ে গেছে ফ্ল্যাটের দরজা, ভেঙেছে জানালার কাচ, বেঁকে গেছে গ্রিল। পুরো বাসার অধিকাংশ জিনিসপত্র পুড়ে গেছে। এ ছাড়া ভবনের অন্য ১১টি ফ্ল্যাটও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অধিকাংশ ফ্ল্যাটের দরজা ও জানালা ভেঙে গেছে।
হালিশহর এইচ ব্লকের ১৮ নম্বর বাড়ির মালিক যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী দিদারুল আলম। ছয়তলা ভবনটিতে আছে ২২টি ফ্ল্যাট। প্রতি তলায় চারটি করে ইউনিট। তিনতলার একটি ফ্ল্যাট বছর দেড়েক আগে ভাড়া নেন শাখাওয়াত হোসেন। তাঁর হালিশহর এলাকায় গ্যারেজ রয়েছে। বাসাটিতে দুই সন্তান, স্ত্রী, গ্যারেজের এক কর্মচারীসহ পাঁচজন থাকতেন। কয়েকদিন আগে চিকিৎসার জন্য তাঁর প্রবাসী ছোট ভাই পরিবার নিয়ে চট্টগ্রামে এলে এই বাসায় ওঠেন।
শাখাওয়াত হোসেনের মুখোমুখি ফ্ল্যাটটি আবিরদের। সাহ্রি খাওয়ার জন্য ঘুম থেকে উঠে ওয়াশরুমে যান আবির। তিনি বলেন, ওয়াশরুম থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরণের ঝাঁকুনিতে দাঁড়ানো থেকে পড়ে যাই। আমাদের বাসার মূল দরজা এসে ফ্রিজের সঙ্গে সজোরে আছড়ে পড়ে। পরে দেখি পাশের বাসার লোকজন শরীরে আগুন নিয়ে বের হচ্ছেন। তাদের ঘরের ভেতরে দাউ দাউ আগুন জ্বলছে।
বিস্ফোরণ হওয়া ফ্ল্যাটটির পাশের ইউনিটে শামীমা আক্তারের ‘তমা বিউটি পার্লার’। তিনি জানান, বিস্ফোরণের সময় তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন। বিকট শব্দে ঘুম ভেঙে গিয়ে দেখেন বাসার দরজা উড়ে এসে তাঁর পার্লারের আলমারি ও শোকেসের কাচ ভেঙে গেছে। চিৎকার শুনে দরজায় গিয়ে দেখেন পাশের বাসার ভেতর আগুন জ্বলছে, ঘরের লোকজন দৌড়ে বের হচ্ছেন। বের হওয়ার সময় তাঁদের শরীরেও আগুন জ্বলতে দেখা যায়। তমার ধারণা, সাহ্রি খাওয়ার সময়ই বিস্ফোরণ ঘটে।
ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেছে, তিনতলার বাসাটির অধিকাংশ জিনিসপত্র পুড়ে গেছে। বাসার দরজা-জানলার অস্তিত্ব নেই। বাসার ড্রয়িং রুমে সোফায় খাবারসহ প্লেট পড়ে আছে। বাসাটির আসবাবপত্র কিছু অক্ষত, কিছু পুড়ে গেছে। বাসার ফ্যান ও জানলার গ্রিল বেঁকে গেছে। পাশে তিনটি ও নিচতলার চারটি ফ্ল্যাটের কোনোটির দরজা অক্ষত নেই।
শরীরে আগুন নিয়ে নেমে আসছিলেন এক নারী
ভোর ৪টা ৩১ মিনিটের দিকে ধারণ করা সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গে সিঁড়িঘর ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। একটি ফ্ল্যাটের দরজা ভেঙে সিঁড়ির দিকে উড়ে আসে এবং আশপাশে কাঠ ও কাচের টুকরো ছড়িয়ে পড়ে। এক নারীকে শরীরে আগুন নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে দেখা যায়। তাঁর পোশাকে আগুন জ্বলছিল। এ সময় অন্যরা আতঙ্কিত অবস্থায় ছুটে আসেন। পরে ভবনের অন্য ফ্ল্যাটের বাসিন্দারাও আতঙ্কে নেমে আসেন।
ফায়ার সার্ভিসের ধারণা গ্যাস থেকে বিস্ফোরণ
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স আগ্রাবাদ নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে জানানো হয়, বিস্ফোরণের পর ওই বাসায় আগুন ধরে যায়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। তবে ফায়ার সার্ভিস পৌঁছানোর আগেই স্থানীয় বাসিন্দারা দগ্ধ ব্যক্তিদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান।
ফায়ার সার্ভিসের চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের উপসহকারী পরিচালক আলমগীর হোসেন বলেন, ওই বাসায় এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করা হতো না। কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির গ্যাস সংযোগ রয়েছে। ধারণা করছি, চুলা থেকে গ্যাস লিক হয়ে রান্নাঘরে জমে ছিল। চুলায় আগুন দিতে গিয়ে গ্যাস বিস্ফোরণেই এই দুর্ঘটনা ঘটে।
বাড়িটির মালিক দিদারুল আলমের পরিবার থাকে একই আবাসিকের জি ব্লকে। খবর পেয়ে তিনি ছুটে আসেন। তাঁর দাবি, ভবনের গ্যাস লাইনে কোনো ধরনের ত্রুটি ছিল না। তারা সবসময় মেরামত করেন। ফায়ার সার্ভিসও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছে। তাঁর ধারণা, ভাড়াটিয়ারা চুলা খোলা রেখেছিলেন, এতেই গ্যাস বের হয়ে জমে যায়।
ভবনটির তত্ত্বাবধায়ক সম্রাট বলেন, ভবনের পকেট গেট খুলে দিয়ে সাহ্রি খেয়ে শুয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ বিকট বিস্ফোরণের শব্দ। মনে হয়েছে ভবনটি ভেঙে পড়ছে। এর পরপর শরীরের আগুন নিয়ে লোকজন নিচে নামতে থাকে।
হাজারীবাগে শিশুসহ দগ্ধ ৪
এদিকে রাজধানীর হাজারীবাগের পূর্ব রায়েরবাজারের ছয়তলা বাড়ির নিচতলায় গ্যাস বিস্ফোরণে দগ্ধ হলেন শেখ রোমান (৩৫), তাঁর স্ত্রী পিংকি আক্তার (৩২), ছেলে রুহান (৩) ও শ্যালক অপু (২৩)। জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের আবাসিক চিকিৎসক শাওন বিন রহমান বলেন, রোমানের শরীরের ৭০ শতাংশ, পিংকির ৭৫, রুহানের ৩৫ ও অপুর ৫০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে।
দগ্ধ রোমানের ভাই মোহাম্মদ মামুন জানান, ভোরে রান্না করতে গিয়ে গ্যাসের চুলায় দিয়াশলাইয়ের কাঠি জ্বালাতেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে। রোমানের গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনায়। তিনি একটি রিয়েল এস্টেট কোম্পানিতে চাকরি করেন।
