ডাকসু নির্বাচন নিয়ে অম্ল-মধুর অভিজ্ঞতা

০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ |

ডাকসু নির্বাচন নিয়ে আমার কৌতূহলের শেষ নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমার কিছু অম্ল-মধুর অভিজ্ঞতা আছে। ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজ থেকে ইতিহাস বিষয়ে অনার্স সম্পন্ন করে মাস্টার্স পড়ার লক্ষ্যে মাত্র একটি বছরের জন্য আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা। এ সময়েই অনুষ্ঠিত হয় একেবারে মহা-ধুমধামের সঙ্গে ডাকসু (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ) নির্বাচন। স্বাধীনতা পরবর্তী চতুর্থ ডাকসু নির্বাচন: ২৩ জানুয়ারি, ১৯৮২।

ডাকসু নির্বাচন হয়েছে ১৯৭২ সালের পর ১৯৭৯ (ছয় বছর অন্তর), ১৯৮২ সালের পর ১৯৮৯ (ছয় বছর অন্তর), ১৯৯০ সালের পর ২০১৯ (সুদীর্ঘ আটাশ বছর অন্তর)। এমনই ‘ধারাবাহিকতায়’ আগামীকাল (পাঁচ বছর অন্তর) অষ্টম ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। প্রতিবছর ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান রয়েছে; সে হিসাবে স্বাধীনতার পর ৫৪ বছরে ৫৪ বার নির্বাচন হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে হয়েছে মাত্র সাতবার (১৯৭২, ১৯৭৯, ১৯৮০, ১৯৮২, ১৯৮৯, ১৯৯০ ও ২০১৯)। ইংরেজ আমলে (১৯২১-১৯৪৭) ১৪ বার, পাকিস্তান আমলে (১৯৪৭-১৯৭১) ১১ বার আর স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত (১৯৭১-২০২৫) সাতবার। টানা ২৮ বছর (১৯৯০-২০১৯) ডাকসু নির্বাচন নেই– ভাবা যায়?

যাহোক, আমার অভিজ্ঞতা বলি, ১৯৮২ সালে তখন বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায়। বিচারপতি আব্দুস সাত্তার দেশের রাষ্ট্রপতি (১৯৮১-৮২) আর অধ্যাপক ফজলুল হালিম চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (১৯৭৬-৮৩)। ছাত্রদলের মাঝে অনৈক্য থাকলেও ছাত্রলীগের অনৈক্য-বিভক্তির বিষয়টি তখন বেশ চোখে পড়ার মতো। ডাকসু নির্বাচনে সংগঠনের ইমেজের চেয়ে ব্যক্তি ইমেজ বেশ বড় হয়ে ওঠে। সরকারি দলের আশীর্বাদপুষ্ট ছাত্রদল মনোনীত ভিপি ও জিএস প্রার্থী যথাক্রমে গোলাম সারওয়ার মিলন ও নজরুল ইসলাম।

ছাত্রলীগের একটি গ্রুপের নেতা তখন ফজলুর রহমান ও বাহলুল মজনুন চুন্নু। নির্বাচনে তাদের ভিপি ও জিএস প্রার্থী যথাক্রমে বাহলুল মজনুন চুন্নু ও শামসুল হক মিয়া; ফজলুর রহমান নিজে প্রার্থী হননি। ছাত্রলীগেরই অন্য একটি গ্রুপের নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন ও আ খ ম জাহাঙ্গীর হোসাইন। এ গ্রুপের প্যানেলে ভিপি ও জিএস প্রার্থী যথাক্রমে ওবায়দুল কাদের ও জাহাঙ্গীর কবীর নানক। জাসদপন্থি ছাত্রলীগের নেতৃত্বে ছিলেন মুনীর উদ্দিন ও আবুল হাসিব খান; তারা উভয়ে দাঁড়ান যথাক্রমে ভিপি ও জিএস পদে। বাসদ সমর্থিত ছাত্রলীগের নেতা আক্তারুজ্জামান (ডাকসুর সাবেক জিএস ১৯৭৯ ও ১৯৮০) ও জিয়াউদ্দিন বাবলু (এজিএস ১৯৮০) নিজেরা হন যথাক্রমে ভিপি ও জিএস প্রার্থী। ছাত্র ইউনিয়নের ভিপি-জিএস প্রার্থী যথাক্রমে আনোয়ারুল হক ও মাহবুবুল মোকাদ্দেম আকাশ।

এ ছাড়া ইসলামী ছাত্রশিবিরের এনাম-কাদের পরিষদ; ভিপি ও জিএস প্রার্থী যথাক্রমে এনামুল হক ও আব্দুল কাদের বাচ্চু এবং ছাত্র সমিতির খবির-মোতাহার পরিষদে যথাক্রমে খবির উদ্দিন আহমেদ ও মোতাহার হোসেন মিলন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

দিনভর মোটামুটি সুষ্ঠু পরিবেশে শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ ও গণনা সম্পন্ন হয়। সেবার ডাকসুতে মোট ১৯টি আসনের মধ্যে বাসদ সমর্থিত ছাত্রলীগ ভিপি ও জিএসসহ ১২টি আসনে জয়ী হয়। ছাত্রদল এজিএসসহ চারটি আসন পায়। আওয়ামী লীগ সমর্থিত ছাত্রলীগ (জালাল-জাহাঙ্গীর) পায় দুটি আসন। আর ইসলামী ছাত্রশিবির একটি।

ভিপি পদে আক্তারুজ্জামান পান (নির্বাচিত) ২৮৫৯ ভোট, বাহালুল মজনুন চুন্নু ১৮৬৩ ভোট (দ্বিতীয় স্থান), গোলাম সারওয়ার মিলন ১২৮২ ভোট (তৃতীয় স্থান), এনামুল হক ১১০০ ভোট (চতুর্থ স্থান) ও ওবায়দুল কাদের ৮৬৯ ভোট (পঞ্চম স্থান)। জিএস পদে জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু (নির্বাচিত) ২০৬৬ ভোট, ছাত্র ইউনিয়নের মাহবুবুল মোকাদ্দেম আকাশ ১৫৩০ ভোট (দ্বিতীয় স্থান) ও ছাত্রশিবিরের আবদুল কাদের বাচ্চু পান ১৪৪১ ভোট (তৃতীয় স্থান)।

ছাত্রদলের গোলাম মোস্তফা ১৭৬৯ ভোট পেয়ে এজিএস নির্বাচিত হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রলীগের (আক্তার-বাবলু) একরামুল হক পান ১৬৪৯ ভোট। আর আওয়ামী লীগ সমর্থিত ছাত্রলীগের প্যানেল (ফজলু-চুন্নু) ডাকসুতে কোনো আসন পায়নি।

১৯৮২ সালের ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে আমি জগন্নাথ হলে ভোট দিই। ডাকসু নির্বাচনে সরকারি দলের সমর্থক ছাত্রদল ও বিরোধী দলের সমর্থক বহুধাবিভক্ত ছাত্রলীগ বিশেষ সুবিধা করতে না পারলেও হল সংসদ নির্বাচনে ছাত্রদল অনেক ভালো করে। ১১টি হলে ১২টি করে মোট ১৩২টি আসনের মধ্যে ছাত্রদল একাই জেতে ৬৫টিতে; তার মানে প্রায় অর্ধেক আসনে ছাত্রদল বিজয়ী। এ ছাড়া হল সংসদের আসনগুলোর মধ্যে ছাত্রলীগ (কাদের-নানক পরিষদ) ১৮, ছাত্র ইউনিয়ন ১৬ ও ছাত্রলীগ (আক্তার-বাবলু) পায় ১৪টি। অন্যদিকে ছাত্রলীগ (মুনীর-হাসিব) ছয়, ছাত্রশিবির ছয় ও ছাত্রলীগ (ফজলু-চুন্নু) পায় তিনটি আসন। আমার প্রিয় জগন্নাথ হল সংসদে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের (হিরন্ময় পাণ্ডে-রঞ্জন কর্মকার) পুরো প্যানেল জয়লাভ করে।

যাহোক, কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়; রাজশাহী, চট্টগ্রাম, জাহাঙ্গীরনগর প্রভৃতি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস এখন সরগরম। ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সবখানেই উৎসবের আমেজ; সবখানেই এক আওয়াজ– ভোট চাই, ভোট দিন। রয়েছে শঙ্কা আর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠাও। দীর্ঘ বন্ধ্যত্বের পর তরুণ-তরুণী শিক্ষার্থীদের সামনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করার সুযোগ এসেছে। আমরা চাই ভালোয় ভালোয় নির্বাচন সম্পন্ন হোক, যা মধুর স্মতি হয়ে থাকবে একেকজনের জীবনে।

বিমল সরকার: অবসরপ্রাপ্ত কলেজশিক্ষক   

You may also like...