দেশের জ্বালানি, রপ্তানি ও রেমিট্যান্স বড় ঝুঁকিতে
প্রকাশ: ১৬ মার্চ ২০২৬
উৎপাদন ব্যয়ের কারণে রপ্তানি খাত প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারাবে। এতে কমবে রপ্তানি আয়। অন্যদিকে, জনশক্তি রপ্তানি মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক হওয়ায় রেমিট্যান্স কমবে। এতে বিদেশি মুদ্রা আহরণে যে ঘাটতি তৈরি হবে, তাতে ডলারের বিপরীতে টাকার মান আবার অস্বাভাবিকভাবে কমে যেতে পারে। শেষ পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ গত অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার আগের সংকটকালে ফিরে যেতে পারে। ইরান যুদ্ধের ধাক্কা, জ্বালানি, রপ্তানি ও রেমিট্যান্সে বড় ঝুঁকি সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর এই চাপ জনজীবন বিপর্যস্ত করে তুলতে পারে।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বিডিবিএল ভবনে ভয়েস ফর রিফর্ম ও পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ যৌথভাবে এই আলোচনা সভার আয়োজন করে। বক্তব্য দেন পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ, ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি ও শাশা ডেনিমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামস মাহমুদ, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শফিকুল আলম, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. সাহাব খান, পাক্ষিক ম্যাগাজিন এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ারের সম্পাদক মোল্লা এম আমজাদ হোসেন, জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিসের (বায়রা) সাবেক মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমান। ভয়েস ফর রিফর্মের সহসমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর সভা পরিচালনা করেন।
জনজীবনে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের সার্বিক প্রভাব তুলে ধরে ড. মাসরুর রিয়াজ বলেন, চলমান সংঘাতের প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মূলত তিনটি প্রধান চ্যালেঞ্জের মুখে আছে। এগুলো হচ্ছে– জ্বালানি সরবরাহ ও দাম, রপ্তানি বাণিজ্য এবং বিদেশে কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স।
জ্বালানি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ বছরের মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত এই তিন মাসে বাংলাদেশে প্রায় ২৫টি এলএনজিবাহী কার্গো আসার কথা। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি সময়মতো আসতে পারেনি। অন্যদিকে, জ্বালানির দামও দ্রুত বাড়ছে। এতে সরকারের আমদানি ব্যয় ও ভর্তুকির চাপ বাড়বে।
রপ্তানি আয় নিয়ে উদ্বেগ
বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান উৎস রপ্তানি খাতও যুদ্ধ এবং জ্বালানি পরিস্থিতিতে সংকটে পড়বে বলে উল্লেখ করেন বক্তারা। তারা বলেন, উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের সক্ষমতা আরও কমবে। যুদ্ধের কারণে ইতোমধ্যে কিছু ব্র্যান্ড-ক্রেতা রপ্তানি আদেশ স্থগিত করেছে।
শামস মাহমুদ বলেন, দেশের শিল্প খাত এমনিতেই নানা কাঠামোগত সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ট্রাম্পের পাল্টা শুল্কসহ নানা কারণে গত টানা সাত মাস রপ্তানি কমছে। জ্বালানি অনিশ্চয়তা, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা হ্রাস– সব মিলিয়ে শিল্প খাত নতুন করে চাপে পড়তে পারে।
রেমিট্যান্স কমার আশঙ্কা
শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমান বলেন, বাংলাদেশের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৪৫ শতাংশ আসে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) দেশগুলো থেকে। যুদ্ধের কারণে এই খাতে ইতোমধ্যে সংকট শুরু হয়ে গেছে। কয়েক দিন ধরে জনশক্তি রপ্তানি বন্ধ। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে যারা কাজ করছেন তারা আছেন জীবন-মরণের ঝুঁকিতে। এখন তাদের বেঁচে থাকাই বড় চ্যালেঞ্জ।
ফাহিম মাশরুর বলেন, প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আসে। সংঘাতের কারণে যদি তা কমে মাসে ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে, তাহলে বছরে বৈদেশিক মুদ্রায় বড় ঘাটতি তৈরি হতে পারে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ বছরে ১০ থেকে ১১ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে জ্বালানি আমদানিতে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম দ্বিগুণের কাছাকাছি হলে এই ব্যয় ১৭ থেকে ১৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শফিকুল আলম বলেন, বাংলাদেশ বছরে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ আমদানিতে। বর্তমানে বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে এবং যুদ্ধজনিত সরবরাহ সংকটের কারণে সামনে লোডশেডিং বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অধ্যাপক ড. সাহাব খান বলেন, বর্তমান সংঘাত শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের অংশ। ভবিষ্যতে জ্বালানি সরবরাহ, শ্রমবাজার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কাঠামোও পরিবর্তিত হতে পারে। তাই বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নিয়ে প্রস্তুত হতে হবে।
মোল্লা এম আমজাদ হোসেন বলেন, জ্বালানি দুর্ভিক্ষে রয়েছে দেশ। এ নিয়ে সঠিক কোনো পরিকল্পনা নেই, নীতি নেই। বিপিসি আমলাদের পুনর্বাসন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
