প্রকাশ: ০৭ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৬:৪৯
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জাতির বহুল আকাঙ্ক্ষিত ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। আশা করছি, সবার অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য, অবাধ ও ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ছাত্র-জনতা রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকার যখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয়, তখন সাধারণ মানুষ আশায় বুক বেঁধেছিল– এই সরকার নিত্যপণ্যের দাম কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। বিগত সরকারের আমলে সুবিধাবাদী ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট ও অতি মুনাফা করার জন্য পণ্যমূল্য বাড়িয়েছিল। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে হুমকি-ধমকি দেওয়া ছাড়া কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সংসারের খরচ চালাতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছে সব শ্রেণি-পেশা ও স্তরের মানুষ। প্রান্তিক ও সীমিত আয়ের মানুষকে প্রতি মাসেই ধারদেনা করে সংসারের খরচ চালাতে হয়েছে। সে কারণে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের কাছে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা তাদের নির্বাচনী অঙ্গীকারে এ ব্যাপারে স্পষ্ট কর্মসূচি। তারা নির্বাচিত হলে নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ, অসাধু ও সিন্ডিকেট করে কারসাজি করা ব্যবসায়ীদের অপতৎপরতা বন্ধে কী কী পদক্ষেপ নেবে? বিগত আওয়ামী লীগ সরকার টানা তিন মেয়াদের বেশি ক্ষমতায় থাকলেও প্রতিবার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে নিত্যপণ্যের মূল্য কমিয়ে রেখে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দেওয়াসহ নানা প্রতিশ্রুতি ছিল। বিশেষ করে দেশের মানুষকে ১০ টাকা কেজিতে চাল খাওয়ানো, ঘরে ঘরে চাকরির ব্যবস্থা, কৃষকের পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতসহ ছিল নানা প্রতিশ্রুতি। কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই পাল্টে যায় দৃশ্যপট। ব্যবসায়ীদের রাজনীতিকীকরণ করা হয়। এমনকি জাতীয় সংসদের সিংহভাগ সদস্য ছিলেন ব্যবসায়ী। সিটি করপোরেশনের মেয়র, উপজেলা চেয়ারম্যান, বিভিন্ন পর্যায়ে দলীয় নেতা নির্বাচনেও ব্যবসায়ীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল। ফলে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি আর রক্ষা করতে পারেনি। ব্যবসায়ীরা যখন এভাবে লুটপাট ও সিন্ডিকেট বাণিজ্য করে অস্বাভাবিকভাবে অতি মুনাফা করে পণ্যমূল্য বাড়িয়ে দেশের মানুষের জীবন-জীবিকায় অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করেছিল, তখন সরকার নীরব থেকে ব্যবসায়ীদের পক্ষে সাফাই গেয়েছে। একটা সময় বড় বড় ব্যবসায়ী ও করপোরেট গ্রুপরা অতি মুনাফা, সিন্ডিকেট ও কারসাজির সঙ্গে জড়িত থাকলেও এখন পাড়া-মহল্লার দোকান ও ভ্যানগুলোও এসব কারসাজিতে জড়িয়ে পড়েছে। ফলে পুরো দেশটাই যেন একটা অতি মুনাফা ও লুটপাটের হাটে পরিণত হয়েছে। সরকার উন্নয়নের কল্পকাহিনি ও অস্বীকারের পন্থা বেছে নিয়ে মানুষের মুখ বন্ধ রেখেছিল। যার কারণেই একটানা তিন মেয়াদের বেশি আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকলেও শেষ মেয়াদের পাঁচ বছর এবং চতুর্থ মেয়াদের ছয় মাসের মধ্যে দেশে নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। বলা যায়, এই সময়ে নিত্যপণ্যের বাজার ছিল দেশের মানুষের কাছে আতঙ্কের বিষয়। এই সময় চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস, সবজি, আলু-পেঁয়াজের মতো খাদ্যপণ্যের দাম যেমন তিন থেকে ১০ গুণ পর্যন্ত হয়েছে, তেমনি খাদ্যবহির্ভূত পণ্য ও সেবার দামও বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে।
বিগত সরকার সব সময় নিজেদের ব্যবসায়ীবান্ধব হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টায় লিপ্ত ছিল। যার কারণে সরকারের চতুর্থ মেয়াদে ব্যবসায়ীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। যেহেতু ব্যবসায়ীরা সরকারের অংশীদার হয়ে মন্ত্রী, এমপি, মেয়র ও ক্ষমতাসীন দলে ক্ষমতার ভাগ বসায়, তখন সরকার অসাধু ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে আইনের কোনো প্রয়োগ করতে পারেনি। তারা দেশের আইনের কোনো তোয়াক্কাই করেনি। ফলে আওয়ামী লীগ সরকারের বিগত ১৫ বছরে নিত্যপণ্যের মূল্য নিয়ে কারসাজির জন্য কোনো ধরনের ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারেনি। পুরো আমলে এভাবে শাস্তির মুখোমুখি না হওয়ায় ব্যবসায়ীরাও সরকারকে কোনোভাবে সমীহ করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেনি। ফলে ব্যবসায়ীরা ইচ্ছামতো পণ্যমূল্য বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের পকেট কাটলেও সরকারি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকজন ছিল নীরব। এই সুযোগে ব্যবসায়ীরা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান লুট, সরকারি প্রণোদনা, ভর্তুকি, কর হ্রাসসহ নানা সুযোগ-সুবিধা হাতিয়ে নিয়েছে। তেল, চাল, ডিম, গমসহ অনেক পণ্য হাতেগোনা কয়েকটি ব্যবসায়ী গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে। তারা পণ্যের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করেই বাজারে কৃত্রিমভাবে মূল্য বৃদ্ধি করে। জোগান ও চাহিদার ভিত্তিতে বাজারের মূল্য নির্ধারিত হবে। কিন্তু বাংলাদেশে এ তত্ত্বটি কাজ করে না। কারণ এখানে ব্যবসায়ীরা সরবরাহ সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করে অর্থনীতির সংজ্ঞাটি কার্যকর করতে দিচ্ছে না। বিগত সময়ে দেখা গেছে, দেশের বড় বড় করপোরেট হাউস সরকারের বড় অর্থ জোগানদাতা। আর এই করপোরেট হাউসগুলোর স্বার্থ সংরক্ষণ করতেন মন্ত্রী, আমলা ও সরকারদলীয় নেতারা। এই চক্রটি এখন নিজেরাই বাঁচার জন্য গা-ঢাকা দিয়েছে অথবা বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে। যদিও রাজনৈতিক দৃশ্যপট পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আর একটি চক্র মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। কিন্তু এ সময়টায় চক্রটির মুখোশ উন্মোচন ও সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে না পারলে তারাও একই প্রক্রিয়ায় কারসাজি করে জনগণের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খাবে।
আমরা লক্ষ্য করছি, ৫ আগস্টের পট পরিবর্তনের পর কিছু পণ্যের দাম সহনীয় থাকলেও বছরজুড়ে সব ধরনের নিত্যপণ্যের দামই আকাশছোঁয়া। এর মূল কারণ অসাধু সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছিল দেশের বাজার ব্যবস্থা। দুঃখজনক হলো, অব্যাহত মূল্যস্ফীতির কারণে ভোক্তাদের যখন দম বন্ধ হওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, সে অবস্থায়ও নানা অজুহাতে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট অতি মুনাফা করে মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়েছে। নিত্যপণ্যের উৎপাদন, মজুত ও সরবরাহ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। বাজার ও মজুতে পণ্যের কোনো ঘাটতি নেই। এর পরও মজুতদার ও সিন্ডিকেটের কারসাজির কারণে পণ্যের দাম লাফিয়ে বাড়ছে। ব্যবসায়ীরা নিত্যনতুন কৌশলে এ কারসাজিতে লিপ্ত ছিল। তারা নির্দিষ্ট একটি সময়ের জন্য এক বা একাধিক পণ্যকে টার্গেট করে পরিকল্পিতভাবে দাম বাড়িয়েছে। আর কৌশলে যুক্ত করেছে আড়তদার, কমিশন এজেন্ট ও সিন্ডেকেট প্রথা। যার মাধ্যমে বাজারে মধ্যস্বত্বভোগী ও শেয়ারবাজারে কারসাজির মতো শেয়ারের দাম বৃদ্ধির কৌশল। অন্যদিকে বাজার তদারকে ব্যবসায়ীদের পরিকল্পিত বাধা, তদারক সংস্থাগুলোর সক্ষমতার অভাবেই বাজারের পূর্ণাঙ্গ তথ্য না থাকায় তারা উৎপাদক, আমদানিকারক, পাইকারি ব্যবসায়ীদের পরিবর্তে শুধু খুচরা ব্যবসায়ী পর্যায়ে তদারক করায় প্রকৃত অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। আর এ সুযোগে অস্বাভাবিক মূল্য বাড়িয়ে অল্প কয়েক দিনে বিপুল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিতে পেরেছে।নিত্যপণ্যের বাজারের লাগাম টানতে বিগত সরকার আলু, পেঁয়াজ, ডিমসহ অনেক পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে দেয়। কিন্তু এসব পণ্যের ক্ষেত্রে দাম কার্যকর করা যায়নি। আলু, ডিম, সয়াবিন তেল, পেঁয়াজ নিয়ে কারা কারসাজি করছে, তার তথ্য সরকারের জানা। কিন্তু কারও বিরুদ্ধে আজ পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারকে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করতে হবে। নিত্যপণ্য-সংক্রান্ত নীতি নির্ধারণে ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণের পাশাপাশি ভোক্তাদের সমঅংশগ্রহণ দরকার। নিত্যপণ্যের কারসাজি রোধে বিদ্যমান আইন প্রয়োগে রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে যথাযথভাবে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। বাজারে কোনো মহল বা গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে প্রভাব বিস্তার করতে চাইলে কঠোর হস্তে দমনের জন্য প্রতিযোগিতা কমিশন ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ছাড়াও নিত্যপণ্যের বাজারে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি পণ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের অপতৎপরতা রোধে শূন্য সহনশীলতা প্রদর্শনে রাজনৈতিক অঙ্গীকারের প্রতিশ্রুতি প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে প্রত্যাশিত।
