প্রকাশ: ০৮ মার্চ ২০২৬
শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলা সদরের বাজার থেকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দূরত্ব প্রায় এক কিলোমিটার। এই সড়কের দুই পাশের ফুটপাতে প্রতিদিন বসে অন্তত দেড়শ দোকান। এসব অবৈধ দোকানের কোনোটি ভ্যানগাড়ির ওপর, কোনোটি আবার টুকরি-খাঁচার। কাপড়, জুতা, ফল, সবজি, মনোহারিসহ নানা পণ্য বিক্রি করেন ভ্রাম্যমাণ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। স্বল্প পুঁজির এসব ব্যবসায়ীর কাছ থেকে প্রতিদিন নির্দিষ্ট হারে চাঁদা আদায় করে একটি চক্র। সড়কটি পৌর এলাকার প্রধান সড়ক হওয়ায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, সহকারী কমিশনারের (ভূমি) কার্যালয়, গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে হয় এখান দিয়ে। ফলে সব সময় এই এলাকা বেচাকেনায় জমজমাট। ফুটপাতে হাঁটতেও বেগ পেতে হয় পথচারীদের। সমস্যায় পড়ে যানবাহনও।
তাঁর ভাষ্য, চালকেরা যদি সড়কে দোকান বসার বিষয় জিজ্ঞেস করেন, তখন দোকানদাররা জবাব দেন, এগুলো তারা ইজারা নিয়েছেন। তাই কিছু বলতে সাহস পান না। তিনি মনে করেন, সড়ক থেকে এসব দোকান সরিয়ে নেওয়া দরকার।
শুক্রবার বিকেলে উপজেলা ভূমি অফিসের সামনে কথা হয় আতিকুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, এখানে ফুটপাত দিয়ে ঠিকমতো হাঁটা যায় না। দোকানদার রাস্তা দখল করে পণ্য রেখেছেন। দুই পাশে ভাসমান দোকান হওয়ায় গাড়িগুলোও যেতে পারছে না। এতে রাস্তা বন্ধ হয়ে ভোগান্তি আরও বেড়ে যায়। রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্সও যেতে পারে না।
এদিন আয়েশা বেগম নামে আরেক নারী বলেন, এসব দোকানের কারণে এত বড় রাস্তা সরু গলিতে পরিণত হয়েছে। এখানে হাঁটার পরিবেশ নেই। ভিড় বাড়লে তো ধাক্কাধাক্কি করে চলতে হয়। নারী ক্রেতারা এখানে এসে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন।
এই সড়কের ওপর সাজিয়ে রাখা কাপড়, জুতা, ফল ও মনোহারি পণ্যের খুচরা-পাইকারি মিলিয়ে অন্তত ১৫০টি দোকানে পণ্যের পসরা। কাগজ-কলমে সড়কটি ১৮ ফুট চওড়া হলেও দোকানের কারণে এখান দিয়ে হেঁটে চলাই কঠিন। ভেদরগঞ্জ পৌরসভা বাজার ইজারা দিলেও ফুটপাত ইজারার মধ্যে পড়ে না। কিন্তু খোকন মোল্লা নামে এক ব্যক্তি ছোট দোকান থেকে ৫০ টাকা, ভ্যান নিয়ে বসা বড় দোকান থেকে ১০০ টাকা চাঁদা তোলেন। সব মিলিয়ে দিনে ১০-১২ হাজার টাকা চাঁদা আদায় হয়।
শুক্রবার বেলা ৩টার দিকে খোকন মোল্লাকে ভ্যানের ওপর বসানো ভ্রাম্যমাণ দোকান থেকে ১০০ টাকা করে চাঁদা আদায় করতে দেখা যায়। এ সময় গোপন ক্যামেরায় তার ভিডিও ধারণ করা হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, উপজেলার ডাকবাংলো থেকে সব ভ্রাম্যমাণ দোকান থেকে টাকা তুলতে তুলতে তিনি হাসপাতাল পর্যন্ত যান। মাঝে এক ওষুধ বিক্রেতা টাকা না দিয়ে প্রতিবাদ করেন। তখন তাঁকে হুমকি দেন খোকন মোল্লা।
প্রায় দুই বছর ধরে ভ্যানে এখানে শিশুদের জামাকাপড় বিক্রি করেন জাহাঙ্গীর আলম। সড়কে দোকান বসানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা নিয়মিত ভাড়া দিয়ে দোকান বসাই। পৌরসভার ইজারাদার খোকন মোল্লা দিনে ১০০ টাকা ভাড়া নেন। যদি অবৈধ দোকান হয়ে থাকে তাহলে ভাড়া নিচ্ছে কেন?’ ভাড়ার কোনো রসিদ আছে কিনা– এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমাদের রসিদ দেয় না। এগুলো সবকিছু খোকন মোল্লা ম্যানেজ করেন। শুধু আমি নই, এখানে ১৫০-এর বেশি দোকান আছে। সবাই একইভাবে দোকানদারি করে।’
ফল ব্যবসায়ী রবিউল হাসান ব্যবসায়ী বলেন, ‘বাজার থেকে শুরু করে হাসপাতাল পর্যন্ত রাস্তা খোকন ভাই ইজারা নিয়েছেন। তাই আমাদের বলছেন, এখানে দোকান বসাতে হলে ১০০ টাকা করে দিতে হবে। যদি টাকা না দিই, তাহলে এখানে বসতে দেবেন না। (শুক্রবার) বিকেলে একজন ভাসমান ওষুধ বিক্রেতা টাকা না দিয়ে প্রতিবাদ করেছেন। তাই তাঁকে মারধর করে উঠিয়ে দিয়েছেন খোকন মোল্লা। আমরা গরিব মানুষ; কী করে খাব বলেন? যেহেতু দোকান করি, তারাও ইজারা আনছে; টাকা তো দিতেই হবে। টাকা না দিলে কাউকেই বসতে দেবে না।’
কে এই খোকন মোল্লা
চাঁদা আদায়কারী খোকন মোল্লা ভেদরগঞ্জ পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের খাড়াকান্দির বাসিন্দা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে তিনি এভাবে চাঁদা তুলছেন। এলাকাবাসী তাঁকে নানা সময়ে বিএনপির মিছিল-সমাবেশে দেখেছেন। অতীতে তিনি জাতীয় পার্টির কর্মী ছিলেন বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে শুক্রবার বিকেলে খোকন মোল্লা বলেন, ‘আমি পৌরসভা থেকে রাস্তা ইজারা নিয়েছি। ভেদরগঞ্জ বাজার থেকে হাসপাতাল পর্যন্ত রাস্তায় যত ভাসমান দোকান বসবে সব আমার ইজারার মধ্যে। আপনি পৌরসভায় খোঁজ নিয়ে দেখেন, আমি ইজারা নিয়েছি কিনা।’ এ সময় ইজারা-সংক্রান্ত কাগজপত্র দেখতে চাইলে দ্রুত ওই জায়গা ছেড়ে চলে যান।
শনিবার উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান তালুকদার রতন বলেন, খোকন মোল্লা নামে কেউ বিএনপির রাজনীতিতে জড়িত নয়। কেউ যদি বিএনপির নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজি করে, তাকে ধরে পুলিশে খবর দেবেন। চাঁদাবাজি করে– এ ধরনের কাউকে বিএনপি ছাড় দেবে না।
ভেদরগঞ্জ থানার ওসি আবুল বাসার বলেন, সড়কের দুই পাশের অবৈধ ভ্রাম্যমাণ দোকান থেকে ইজারার নামে চাঁদাবাজির সুযোগ নেই। কেউ চাঁদাবাজি করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পৌরসভার প্রশাসকের দায়িত্বে থাকা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কেএম রাফসান রাব্বি বলেন, ‘সড়ক ইজারা দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। যদি কেউ সড়কের পাশে অবৈধ দোকান বসিয়ে টাকা তোলেন, এগুলো চাঁদাবাজি ছাড়া আর কিছু নয়। আমরা একাধিকবার অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছি। কিন্তু অভিযান শেষ হওয়ার পরই দোকানিরা আগের অবস্থায় ফিরে যান।’
ইউএনও হাফিজুল হক বলেন, সড়কের দুপাশে অবৈধ দোকান বসানোর সুযোগ নেই। কেউ অবৈধভাবে দোকান বসানোর চেষ্টা করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সড়কের শৃঙ্খলা রক্ষায় দু-এক দিনের মধ্যে অভিযান করবেন।
