ব্যাংকের উচ্চ পর্যায়ে নারীর অংশ বাড়ছে

প্রকাশ: ০৮ মার্চ ২০২৬

সার্বিকভাবে পুরুষের তুলনায় ব্যাংকে নারী কর্মীর অনুপাত কম। তবে এর মধ্যেও ব্যাংকের উচ্চ পর্যায়ে নারীদের অংশ বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, গত জুন পর্যন্ত ব্যাংক খাতের উচ্চ পর্যায়ে কর্মরতদের মধ্যে ১০ দশমিক ২৫ শতাংশ নারী। ৬ মাস আগে যা ছিল ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ। আর পাঁচ বছর আগে উচ্চ পর্যায়ে নারীর অংশ ছিল ৯ দশমিক ৩৭ শতাংশ। কয়েক বছর ধরে এই হার ১০ শতাংশের নিচে ছিল। অবশ্য সার্বিকভাবে নারী কর্মীর হার গত জুনে কমেছে।

ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের ধাক্কা লাগে ব্যাংক খাতেও। বিশেষ করে বেসরকারি ব্যাংকের শুরুর পর্যায়ের কর্মীর সংখ্যা অনেক কমেছে। নানা অনিয়ম-জালিয়াতিতে সম্পৃক্ততার দায়ে অন্তর্বর্তী সরকার ১৫টি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে পুনর্গঠন করে দেয়। পর্ষদে পরিবর্তনে এসব ব্যাংকে অনেকে চাকরি হারিয়েছে। চাকরি হারানোর সবই ছিল শুরুর পর্যায়ের কর্মী।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জুন পর্যন্ত ব্যাংক খাতে মোট কর্মীর সংখ্যা কমে দুই লাখ ১৩ হাজার ২৬৭ জনে নেমেছে। ২০২৪ সালের বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত যেখানে কর্মী ছিলেন দুই লাখ ১৪ হাজার ২৪৫ জন। মূলত বেসরকারি খাতের ব্যাংকে দুই হাজার ১৪ জন নারী কর্মী কমার প্রভাবেই সামগ্রিকভাবে কর্মীর সংখ্যা কমেছে। গত বছরের জুন শেষে নারী কর্মীর সংখ্যা কমে ৩৫ হাজার ৭৮২ জনে নেমেছে। মোট কর্মীর যা ১৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ। ৬ মাস আগে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে যেখানে মোট নারী কর্মী ছিলেন ৩৭ হাজার ৬৪৯ জন। মোট কর্মীর যা ছিল ১৭ দশমিক ৫৭ শতাংশ। এর মানে ৬ মাস আগের তুলনায় নারী কর্মী কমেছে এক হাজার ৮৬৭ জন। এ সময়ে পুরুষ কর্মী ৮৮৯ জন বেড়ে এক লাখ ৭৬ হাজার ৫৯৬ জন হয়েছে। আগে যা ছিল এক লাখ ৭৭ হাজার ৪৮৫ জন।
প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, গত জুনে মধ্যবর্তী পর্যায়েও নারীর অংশ বেড়ে ১৫ দশমিক ৮৪ শতাংশ হয়েছে। ৬ মাস আগে যা ছিল ১৫ দশমিক ৪৪ শতাংশ। আর প্রারম্ভিক পর্যায়ে  ১৭ দশমিক ৬৬ শতাংশে নেমেছে। ২০২৪ সালের জুন শেষে যা ছিল ১৮ দশমিক ৮৭ শতাংশ।

পরিচালনা পর্ষদে নারীর অংশ কমে গত বছরের জুনে ১২ দশমিক ৯৭ শতাংশে নেমেছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে যা ছিল ১৩ দশমিক ৬১ শতাংশ। নারী কর্মীর হারে সবচেয়ে এগিয়ে আছে বিদেশি ব্যাংকগুলো। গড়ে এসব ব্যাংকের মোট কর্মীর ২৫ শতাংশের বেশি নারী। অন্য ব্যাংকগুলোর মধ্যে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ রয়েছে রাষ্ট্রীয় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে। এ ছাড়া বেসরকারি ব্যাংকের মোট কর্মীর ১৬ দশমিক ৬২ শতাংশ নারী।

এদিকে বিভিন্ন উদ্যোগে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। বিশেষ করে কটেজ, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) খাতে নারীদের যুক্ত করতে অনেক ব্যাংক আলাদা প্রোডাক্ট চালু করেছে। বিনা জামানতে নারীদের জন্য ২৫ লাখ টাকা ঋণ দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) নেই এমন ব্যবসায়ী অন্য ব্যবসা সংক্রান্ত সনদ দিয়ে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।

মোট সিএমএসএমই ঋণের অন্তত ১৫ শতাংশ নারীদের মাঝে বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে বেশির ভাগ ব্যাংক এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে। গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সিএমএসএমইতে ব্যাংকগুলোর মোট ঋণস্থিতি দাঁড়িয়েছে তিন লাখ ১২ হাজার ৫১২ কোটি টাকা। এর মধ্যে নারী উদ্যোক্তাদের ঋণ মাত্র ১৯ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা যা ৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ।
প্রাইম ব্যাংকের হেড অব লায়াবিলিটি অ্যান্ড উইমেন ব্যাংকিং শায়লা আবেদিন বলেন, নারীদের ওপর বিনিয়োগ মানে উদ্ভাবন, দৃঢ়তা এবং প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যতের ওপর বিনিয়োগ করা। নারীর ক্ষমতায়ন হলে ব্যবসা ও সমাজ— দুটিই রূপান্তরিত হয়। তবে শুধু প্রতীকী উদ্যোগে প্রকৃত পরিবর্তন আসে না। সত্যিকারের ক্ষমতায়নের জন্য প্রয়োজন কাঠামোগত পরিবর্তন, নেতৃত্ব বিকাশ এবং এমন একটি কর্মপরিবেশ যেখানে নারীরা কোনো বাধা ছাড়াই নিজেদের সম্ভাবনা বিকশিত করতে পারে। জবাবদিহীতা, সমতা ও পারস্পরিক সম্মানের সংস্কৃতিই নারী নেতৃত্বের পূর্ণ সম্ভাবনা উন্মোচনের ভিত্তি। ভবিষ্যতের নেতৃত্ব হবে বহুমাত্রিক। যে প্রতিষ্ঠানগুলো শীর্ষপর্যায়ে নারীদের সক্ষমতাকে কাজে লাগাতে পারবে, তারাই আগামী দিনের সাফল্য ও রূপান্তরমূলক প্রবৃদ্ধির নেতৃত্ব দেবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *