অনুমতি দেয়, মানোন্নয়নে নেই শিক্ষা বোর্ডের তদারকি

উচ্চ মাধ্যমিকে বরিশাল শিক্ষা বোর্ডে ১২ প্রতিষ্ঠানে এবার একজনও পাস করেনি। এর মধ্যে আবার ছয়টিতে সাকল্যে শিক্ষার্থী ছিল একজন করে। ব্যর্থতার ‘ষোলোকলা’ পূর্ণ করা এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সরকারি কলেজও রয়েছে।

ব্যর্থতার বিষয়ে প্রতিষ্ঠানপ্রধানরা জানান, এমপিওভুক্ত না হওয়ায় শিক্ষক ধরে রাখতে পারেন না তারা। অনুমোদন টেকাতে পকেটের টাকায় কিছু শিক্ষার্থী ভর্তি দেখান। দিন শেষে সফলতা আসে না।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষা বোর্ড উদাসীন। অনুমোদন দিয়েই তারা দায় সারে। মানোন্নয়ন ও নিয়মিত তদারকি করে না। বারবার একই প্রতিষ্ঠান থেকে একজন করে পরীক্ষা দিয়ে অকৃতকার্য হলেও কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না বোর্ড।

বরগুনার বামনার সরকারি সারওয়ার জাহান পাইলট মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের একমাত্র পরীক্ষার্থী এবার পাস করতে পারেনি। গত বছর চারজনের মধ্যে কৃতকার্য হয় দুজন। ১৯৪৪ সালে প্রতিষ্ঠিত স্কুলে কলেজ শাখা চালু হয় ২০১২ সালে। ২০১৮ সালে জাতীয়করণের পর দুরবস্থা শুরু ২০২০ সালে।
কর্তৃপক্ষের দাবি, তৎকালীন প্রধান শিক্ষকের ভুলে কলেজ শাখা জাতীয়করণের আওতায় আসেনি। বেতন-ভাতা দিতে না পারায় শিক্ষকরা থাকেন না। বর্তমানে চার শিক্ষক দিয়ে চলছে কার্যক্রম।

গত রোববার দুপুরে সরেজমিন একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে কাউকে পাওয়া যায়নি। শিক্ষকরা একাদশে ১৫ ও দ্বাদশে ২৫ শিক্ষার্থীর তথ্য দিলেও খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শিক্ষার্থীর অভাবে কোনো ক্লাসই হয় না।

শিক্ষক জাকির হোসেন বলেন, ২০২০ সালে ৪০ এবং ২০২১ সালে পরীক্ষার্থী ছিল ৩০ জন। এরপর থেকে কমতে থাকে। এখন কলেজের অনুমতি বাঁচাতে নিজেদের টাকায় কিছু শিক্ষার্থী ভর্তি করি। প্রধান শিক্ষক নুরুল আলম বলেন, কাগজে কিছু শিক্ষার্থী ভর্তি দেখানো হলেও বাস্তবে কলেজ শাখায় কোনো ক্লাস হয় না। এক কিলোমিটারের মধ্যে বামনা সরকারি ডিগ্রি কলেজ ও সরকারি ফয়জুননেছা মহিলা কলেজ থাকায় আমাদের কলেজ সরকারি হয়নি।

পটুয়াখালীর দুমকী সদরের নাসিমা কেরামত আলী মহিলা কলেজ কাগজে থাকলেও কোনো ক্যাম্পাস নেই। নাসিমা কেরামত আলী গার্লস স্কুলের বর্ধিত ভবনের দোতলায় ছয়টি কক্ষে চলে কার্যক্রম। লতিফ মোহসেনা মাধমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আবু জাফরকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ দেখানো হয়েছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী না থাকায় কক্ষ তিনটি কালেভদ্রে খোলা হয়। গত বছর দুজনের একজন পাস করেছিল। এবার একজনই অকৃতকার্য।

আবু জাফর বলেন, ২০০০ সালে কলেজ স্থাপনের পর ভালো ফল হয়েছে। এমপিওভুক্ত না হওয়ায় শিক্ষকরা থাকেন না।

বরিশালের বাবুগঞ্জের মোহনগঞ্জ স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী ইমন হোসেন ২০২২ সাল থেকে পরীক্ষা দিয়ে একবারও পাস করেনি। রেজিস্ট্রেশনের মেয়াদ শেষ হওয়ায় আগামীবার দিতে পারবে না। নতুন শিক্ষার্থীও পায়নি কর্তৃপক্ষ। প্রধান শিক্ষক অনিল চন্দ্র বিশ্বাস জানান, গত দুই বছরে একজন শিক্ষার্থীও ভর্তি হয়নি। কলেজ শাখা বন্ধ করা হবে।

ভোলা সদরের মেদুয়া কলেজ ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও পাঠদানের অনুমতি পায় দুই বছর আগে। এ বছর প্রথম অংশ নিলেও একমাত্র পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য। কলেজটির প্রতিটি কাজে সম্পৃক্ত স্থানীয় বাসিন্দা আকতার হোসেন বলেন, ভাগনি মুক্তা বেগমকে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি করেছিলাম। কিন্তু ক্লাস হয় না। বাধ্য হয়ে তাকে কবি মুজাম্মেল হক কলেজে ভর্তি করি। এবার এইচএসসি পাস করেছে।

মেদুয়া কলেজ থেকে সদ্য চাকরি ছেড়ে আসা অধ্যক্ষ আবদুল করিম বলেন, জবরদস্তি করে পাঁচজনের ফরম ফিল-আপ করানো হয়। চারজন পরীক্ষাতেই বসেনি। কাগজে অনেক দেখানো হলেও কোনো শিক্ষার্থী নেই। প্রতিষ্ঠাতা নিয়োগ বাণিজ্যের জন্যই কলেজ করে রেখেছেন।

ভোলার বোরহানউদ্দিনের দেউলা তালুকদার বাড়ি স্কুল অ্যান্ড কলেজ ২০২১ সালে উচ্চ মাধ্যমিকে পাঠদানের অনুমতি পায়। ২০২৩ সালে প্রথম পাঁচজন এবং ২০২৪ সালে দুজন পরীক্ষা দেয়। পাস করে একজন করে। এবার অকৃতকার্য শিক্ষার্থী আগামী বছর পরীক্ষা দিলে শিক্ষার্থী হবে দুজন। অন্যদিকে, এ বছর একাদশে ভর্তি হয়েছে চারজন।

১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানের বেহাল দশা নিয়ে প্রধান শিক্ষক স্বপন ভক্ত বলেন, এখান থেকে এসএসসি পাস করে ছাত্ররা অন্য কলেজে ভর্তি হয়। ফল খারাপের জন্য এ বছর প্রথম বোর্ডের শোকজ পেয়ে জবাব দিয়েছি।

ঝালকাঠির নলছিটির রানাপাশা মাধ্যমিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে ২০২৩ সালে দুই ও ২০২৪ সালে একজন পরীক্ষা দিয়ে পাস করেছিল একজন করে। এ বছর একমাত্র শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। ১৯৩০ সালে স্থাপিত স্কুলটি কলেজে উন্নীত হয়ে ২০১৮ সাল থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় বসছে। ওই বছর ৪৮ পরীক্ষার্থীর ২৬ জন পাস করেছিল। এর পর থেকে শিক্ষার্থী কমতে থাকে। প্রধান শিক্ষক বাবুল চক্রবর্তী বলেন, একজন শিক্ষক দিয়ে কলেজ চালাচ্ছেন তিনি। ফলাফল আসবে কীভাবে?

বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ইউনুস আলী সিদ্দিকী সমকালকে বলেন, স্কুলকে কলেজে উন্নীত করার ক্ষেত্রে কিছু ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। এসব প্রতিষ্ঠান তাদের এসএসসি পাস করা শিক্ষার্থীও ধরে রাখতে পারে না। বোর্ডে ডাকা হলে সুযোগ চেয়ে অঙ্গীকার করেছে। শিক্ষার্থী বাড়াতে না পারলে বন্ধ করে দেওয়া হবে।